শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও মুক্তচিন্তার শিক্ষাঙ্গন পর্ব ২
asif
প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:১৩ পিএম
ড. মাহরুফ চৌধুরী
ব্রিটিশ উপনিবেশিক প্রেক্ষাপটে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) এমন এক শিক্ষাব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে মানুষ কেবল পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞান অর্জন করবে না; বরং প্রকৃতির সঙ্গে, সংস্কৃতির সঙ্গে, সমাজের সঙ্গে এবং সর্বোপরি মানবতার সঙ্গে তার একটি গভীর ও সৃজনশীল সম্পর্ক গড়ে উঠবে। তাঁর শিক্ষাভাবনার কেন্দ্রে ছিল মানুষের সামগ্রিক বিকাশ তথা শরীর, মন, বুদ্ধি, নন্দনবোধ, সৃজনশীলতা ও নৈতিক চেতনার সমন্বিত বিকাশ। এই আদর্শকে বাস্তবে পরীক্ষা ও প্রয়োগ করার উদ্দেশ্যেই তিনি শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সীমাবদ্ধতার বাইরে গিয়ে তিনি এমন একটি শিক্ষাপরিবেশ নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন, যেখানে প্রকৃতি হবে শিক্ষার সহচর, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক হবে মানবিক ও সংলাপভিত্তিক এবং জ্ঞান হবে জীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত। রবীন্দ্রনাথ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে কোনো যান্ত্রিক কারখানায় পরিণত করতে চাননি, যেখানে একই ছাঁচে অসংখ্য শিক্ষার্থীকে তৈরি করা হবে। তাঁর কাছে প্রত্যেক মানুষ ছিল স্বতন্ত্র সম্ভাবনার অধিকারী। তাই শিক্ষার কাজ হলো সেই সম্ভাবনাকে আবিষ্কার ও বিকশিত করার সুযোগ সৃষ্টি করা; একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে মানুষকে ঢেলে দেওয়া নয়। তিনি শিক্ষার মধ্যে আনন্দ, সৌন্দর্য, কৌতূহল, সৃজনশীলতা ও স্বাধীনতার অবকাশ রাখতে চেয়েছিলেন। তাঁর শিক্ষাদর্শের এই মানবিক দিকটি আজও আমাদের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক; বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন পরীক্ষার ফল, সনদ, চাকরির প্রতিযোগিতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্যের চাপ শিক্ষার বৃহত্তর মানবিক উদ্দেশ্যকে অনেক সময় আড়াল করে ফেলে।
রবীন্দ্রনাথের কাছে শিক্ষা মানে ছিল মুক্তি। সেই মুক্তি শুধু অজ্ঞতা থেকে মুক্তি নয়, সংকীর্ণতা থেকে মুক্তি; শুধু অশিক্ষা থেকে মুক্তি নয়, ভয় থেকে মুক্তি; শুধু কুসংস্কার থেকে মুক্তি নয়, অন্ধ আনুগত্য থেকেও মুক্তি। তাঁর শিক্ষাভাবনার গভীরে ছিল মানুষের আত্মমর্যাদা ও স্বাধীন সত্তার বিকাশ। তিনি এমন মানুষ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, যে নিজের চোখে পৃথিবীকে দেখতে পারে, নিজের বুদ্ধিতে বিচার করতে পারে এবং নিজের বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থাকতে পারে। তাই তাঁর শিক্ষাদর্শের প্রকৃত তাৎপর্য কেবল একটি বিশেষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাঠামোয় নয়; বরং মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদার প্রতি তাঁর গভীর আস্থায় নিহিত। আজকের বাংলাদেশের শিক্ষা-আলোচনায় রবীন্দ্রনাথের এই মুক্তির দর্শনকে নতুন করে স্মরণ করা প্রয়োজন। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এমন হতে হবে, যা শিক্ষার্থীকে কেবল পরীক্ষায় সফল হওয়ার জন্য প্রস্তুত করবে না; বরং তাকে জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্রকে বোঝার এবং প্রয়োজন হলে প্রচলিত বাস্তবতাকে প্রশ্ন করার সক্ষমতা দেবে। তাকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে সে ভিন্নমতকে ভয় না পায়, যুক্তিকে অবজ্ঞা না করে, ক্ষমতার সামনে অন্ধভাবে নত না হয় এবং নিজের বিবেককে কোনো দলীয় বা গোষ্ঠীগত আনুগত্যের কাছে সমর্পণ না করে। একই সঙ্গে তাকে নিজের সংস্কৃতি ও ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করবে, আবার সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা কিংবা গোষ্ঠীগত বিদ্বেষের ঊর্ধ্বে উঠে বৃহত্তর মানবিকতার বোধও জাগ্রত করবে।
কাজী নজরুল ইসলামও (১৮৯৯-১৯৭৬) শিক্ষাকে কেবল জ্ঞানার্জনের প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেননি। তিনি শিক্ষাকে মানুষের মুক্তি, আত্মমর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অন্যতম শক্তি হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। তাঁর সাহিত্য, প্রবন্ধ, বক্তৃতা ও সামগ্রিক জীবনদর্শনের গভীরে ছিল মানুষের মুক্তির আকাক্সক্ষা। তিনি এমন এক শিক্ষার পক্ষে ছিলেন, যা মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখাবে, বৈষম্যের শৃঙ্খল ভাঙতে সাহস দেবে এবং নিজস্ব চিন্তা ও বিবেকের আলোয় সত্যকে অনুসন্ধান করার শক্তি জোগাবে। নজরুলের কাছে মানুষই ছিল সর্বোচ্চ মূল্যবোধ। ধর্ম, বর্ণ, জাতি কিংবা সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে বিভাজন তিনি মেনে নিতে পারেননি। তাই তাঁর শিক্ষাভাবনার কেন্দ্রে ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা, অসাম্প্রদায়িকতা এবং মুক্তচিন্তার বিকাশ। তিনি এমন শিক্ষার স্বপ্ন দেখেছিলেন, যা মানুষের মধ্যে বিদ্বেষ নয়, সহমর্মিতা সৃষ্টি করবে; বিভাজন নয়, সংহতি গড়ে তুলবে; অন্ধ আনুগত্য নয়, সত্য ও ন্যায়ের প্রতি দায়বদ্ধতা তৈরি করবে। নজরুল বারবার মানুষকে শৃঙ্খলমুক্ত হওয়ার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতে আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বিদ্রোহ ছিল কেবল রাজনৈতিক শাসনের বিরুদ্ধে নয়; অজ্ঞতা, কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা, সামাজিক অবিচার এবং চিন্তার দাসত্বের বিরুদ্ধেও। এই অর্থে তাঁর শিক্ষাদর্শ ছিল গভীরভাবে মুক্তিকামী। তিনি এমন মানুষ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, যে অন্যায়ের সামনে নীরব থাকবে না, ক্ষমতার ভয়কে সত্যের উপরে স্থান দেবে না এবং মানুষের মর্যাদাকে সব ধরনের সংকীর্ণ পরিচয়ের ঊর্ধ্বে মূল্যায়ন করবে।
আজকের বাংলাদেশে, যেখানে কখনো কখনো মতভেদকে বিরোধিতা হিসেবে এবং প্রশ্ন করাকে অবাধ্যতা হিসেবে দেখা হয়, সেখানে নজরুলের এই মুক্তচেতা মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। শিক্ষা যদি সত্যিই মানুষের ভেতরে সাহস, সহনশীলতা, ন্যায়বোধ ও মানবিক সংবেদনশীলতা জাগিয়ে তুলতে না পারে, তবে তা কেবল তথ্য ও দক্ষতা অর্জনের একটি সীমিত প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়; মানুষের প্রকৃত বিকাশের মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে না। এই কারণেই আমাদের শিক্ষার লক্ষ্য কেবল ‘শিক্ষিত’ মানুষ তৈরি করা নয়; বরং আলোকিত, মানবিক, যুক্তিবাদী, সৃজনশীল ও দায়িত্বশীল মানুষ তৈরি করা। জাতীয় উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য দক্ষ জনশক্তি অবশ্যই প্রয়োজন; কিন্তু দক্ষতার সঙ্গে যদি নৈতিকতা, মানবিকতা, মুক্তবুদ্ধি এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের সমন্বয় না ঘটে, তাহলে সেই দক্ষতা কখনোই একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী সমাজ নির্মাণের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। শিক্ষা তখন কেবল কর্মসংস্থানের উপকরণ হয়ে ওঠে; মানুষ গড়ার শক্তি হয়ে উঠতে পারে না। রবীন্দ্রনাথ আমাদের শিখিয়েছেন শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের অন্তর্গত সম্ভাবনার বিকাশের কথা; নজরুল আমাদের শিখিয়েছেন সেই মানুষকে অন্যায় ও সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে সাহসের সঙ্গে দাঁড়াতে হবে। একজন শিক্ষা দিয়েছেন স্বাধীন চিন্তার সৌন্দর্য, অন্যজন শিখিয়েছেন স্বাধীন চিন্তার সাহস। একজন দেখিয়েছেন মানবিক বিকাশের পথ, অন্যজন দেখিয়েছেন মানবিক মর্যাদা রক্ষার সংগ্রাম। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা যদি এই দুই মহান মনীষীর মানবিক ও মুক্তিকামী দর্শন থেকে শিক্ষা নিতে পারে, তাহলে শিক্ষা সত্যিকার অর্থেই ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের ইতিবাচক রূপান্তরের শক্তিতে পরিণত হতে পারে।
আজকের বাংলাদেশে শিক্ষা হয়ে উঠুক মানুষের মানবিক উৎকর্ষ, মুক্তবুদ্ধির বিকাশ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার সেই জীয়নকাঠি, যে শিক্ষা মানুষকে কেবল জীবিকা অর্জনের যোগ্য করে তুলবে না; তাকে নিজের বিবেকের কাছে স্বাধীন, সত্যের কাছে সৎ, সমাজের কাছে দায়িত্বশীল এবং মানবতার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ মানুষ হিসেবেও গড়ে তুলবে। যে শিক্ষা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখাবে, আবার শুনতেও শেখাবে; নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করবে, আবার অন্যের অধিকারকে সম্মান করতেও উদ্বুদ্ধ করবে; নিজের সংস্কৃতি ও ইতিহাসের প্রতি গর্ববোধ জাগাবে, আবার বিশ^মানবতার বৃহত্তর পরিসরের সঙ্গেও তাকে যুক্ত করবে। এমন শিক্ষাই পারে মুক্তচিন্তার শিক্ষাঙ্গন নির্মাণ করতে; এমন শিক্ষাই পারে একটি অধিকতর ন্যায়ভিত্তিক, সহনশীল, গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশের ভিত্তি রচনা করতে। আমাদের শিক্ষার লক্ষ্য তাই কেবল ‘শিক্ষিত’ মানুষ তৈরি করা নয়; বরং আলোকিত, মানবিক, যুক্তিবাদী, সৃজনশীল, প্রতিবাদী ও দায়িত্বশীল মানুষ তৈরি করা। জাতীয় উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য দক্ষ জনশক্তি অবশ্যই প্রয়োজন; কিন্তু দক্ষতার সঙ্গে যদি নৈতিকতা, মানবিকতা, মুক্তবুদ্ধি, সৎসাহস ও নাগরিক দায়িত্ববোধের সমন্বয় না ঘটে, তাহলে সেই দক্ষতা কখনোই একটি ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণমুখী সমাজ নির্মাণের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। তাই আজকের বাংলাদেশে শিক্ষা হয়ে উঠুক মানুষের মানবিক উৎকর্ষের মধ্য দিয়ে মুক্তির সেই জীয়নকাঠি-যে শিক্ষা মানুষকে কেবল জীবিকা অর্জনের যোগ্য করে তুলবে না, তাকে নিজের বিবেকের কাছে স্বাধীন, সমাজের কাছে দায়িত্বশীল এবং সত্যের কাছে সৎ মানুষ হিসেবেও গড়ে তুলবে।
লেখক : ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য
