চেক ডিজঅনার মামলায় পাওনা শোধ ও সমঝোতা হলে দ- নয়: হাইকোর্ট
asif
প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪৮ পিএম
চেক ডিজঅনার মামলায় পাওনা শোধ ও সমঝোতা হলে দ- নয়: হাইকোর্ট
বিশেষ প্রতিনিধি - চেক ডিজঅনার মামলায় চেকে উল্লেখিত আর্থিক দায় সম্পূর্ণ পরিশোধ এবং পক্ষগুলোর মধ্যে আপস-মীমাংসা হলে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে কারাগারে পাঠানো বা কারাদ- বহাল রাখা সমীচীন নয় বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, চেক ডিজঅনার মামলার মূল উদ্দেশ্য কাউকে শাস্তি দেওয়া বা কারাগারে পাঠানো নয়; বরং পাওনা টাকা আদায় নিশ্চিত করা। ‘মো. আবদুল হান্নান মাস্টার বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য’ মামলায় করা ক্রিমিনাল আপিল নিষ্পত্তি করে হাইকোর্টের বিচারপতি মো. বশির উল্লাহর একক বেঞ্চ এই রায় দেন। গত ৬ সেপ্টেম্বর রায়টি দেওয়া হয়। রায়ে চেকের টাকা ও ব্যাংকের পাওনাদি পুরোপুরি পরিশোধ করে আপস-মীমাংসা করায় আবদুল হান্নার মাস্টারকে দেওয়া এক বছরের কারাদ- বাতিল করেছেন আদালত। একই সঙ্গে আপিলের আগে অধস্তন আদালতে জমা দেওয়া ১৪ হাজার ১০০ টাকা ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সকে বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মামলার নথি থেকে জানা যায়, সিরাজগঞ্জের বাসিন্দা মো. আবদুল হান্নান মাস্টার ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্স থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নেন। পরবর্তীতে তিনি ২১ হাজার ৮৭৫ টাকা পরিশোধ করেন। বকেয়া ২৮ হাজার ১২৫ টাকার বিপরীতে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের সিরাজগঞ্জ শাখার একটি চেক দেন তিনি। ২০০৯ সালের ১৯ জানুয়ারি চেকটি নগদায়নের জন্য ব্যাংকে উপস্থাপন করা হলে ১০ ফেব্রুয়ারি ‘পর্যাপ্ত তহবিল না থাকায়’ চেকটি ডিজঅনার হয়। পরে আইন অনুযায়ী লিগ্যাল নোটিশ দেওয়া হলেও টাকা পরিশোধ না করায় ওই বছর নালিশি সিআর মামলা করা হয়। মামলাটি ২০১২ সালে বিচারের জন্য সিরাজগঞ্জের দায়রা জজ আদালতে স্থানান্তরিত হয়। আসামি পলাতক থাকায় তার অনুপস্থিতিতেই বিচারকাজ সম্পন্ন হয়। পরে ২০১৩ সালের ১৯ মার্চ সিরাজগঞ্জের দায়রা জজ আসামিকে নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্টস (এনআই) অ্যাক্ট, ১৮৮১ এর ১৩৮ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে এক বছরের সশ্রম কারাদ- এবং ৮৪ হাজার ৩৭৫ টাকা জরিমানা করেন। এরপর ওই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে ক্রিমিনাল আপিল ও জামিন আবেদন করেন আবদুল হান্নান মাস্টার। ২০১৮ সালের ৭ আগস্ট হাইকোর্ট তাকে এক বছরের জন্য জামিন দেন। আপিল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় চেকের অবশিষ্ট অর্থ ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সকে পরিশোধ করেন আবদুল হান্নান মাস্টার। পরে চলতি বছরের ২১ জুলাই তার সঙ্গে ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সের আপসনামা সই হয়। রায়ে হাইকোর্ট বলেন, মামলার তথ্য ও পারিপার্শ্বিকতা, অপরাধের মাত্রা এবং আপিলকারী কর্তৃক চেকের সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধের বিষয় বিবেচনায় নিয়ে আবদুল হান্নান মাস্টারের দোষী সাব্যস্তকরণ বহাল রাখা হলো। তবে ৮৪ হাজার ৩৭৫ টাকা অর্থদ- কমিয়ে ২৮ হাজার ১২৫ টাকা করা হলো, যা চেকের অঙ্কের সমপরিমাণ। আদালত আরও বলেন, দ-প্রাপ্ত আপিলকারী আপিল দায়েরের আগে বিচারিক আদালতে ১৪ হাজার ১০০ টাকা জমা দিয়েছেন। পরবর্তীতে অবশিষ্ট টাকা সরাসরি নালিশকারী ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সের কাছে পরিশোধ করেছেন। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট আদালতকে জমা দেওয়া ১৪ হাজার ১০০ টাকা যথাযথ শনাক্তকরণ সাপেক্ষে অবিলম্বে ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সকে বুঝিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে নথিপত্রসহ রায়ের অনুলিপি সংশ্লিষ্ট আদালতে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। এ মামলায় রায় ঘোষণার সময় আবেদনের পক্ষে কোনো আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন না। বিবাদীপক্ষে (ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্স) ছিলেন আইনজীবী মো. জিসান মাহমুদ। তার সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী তাসনুভা কায়সার। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. মিজানুর রহমান ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মো. সিরাজুল করিম (রবি)। ব্র্যাক মাইক্রোফাইন্যান্সের আইনজীবী মো. জিসান মাহমুদ বলেন, আদালত এ রায়ের মাধ্যমে আইনি সুবিচারের সঙ্গে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির অনন্য প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল পাওনা টাকা আদায় করা, কাউকে অহেতুক শাস্তি দেওয়া নয়। তিনি বলেন, যেহেতু আপিলকারী চেকের পুরো অর্থ পরিশোধ করে দিয়েছেন এবং আপসনামায় সই করেছেন, তাই আমরা উদার মনোভাব নিয়ে তার কারাদ- মওকুফের বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছিলাম। আদালত চেকের সমপরিমাণ অর্থদ- বহাল রেখে আপিলকারীর কারাদ- বাতিল করায় আমরা কোনো ধরনের আপত্তি করিনি। বরং আদালতের এ ন্যায়বিচারকেন্দ্রিক সিদ্ধান্তকে আমরা সাধুবাদ জানাই।
