Logo
Logo
×

উপসম্পাদকীয়

প্রাথমিক শিক্ষায় প্রত্যাশা নাকি প্রচেষ্টা

asif

asif

প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৫৬ পিএম

প্রাথমিক শিক্ষায় প্রত্যাশা নাকি প্রচেষ্টা

প্রাথমিক শিক্ষায় প্রত্যাশা নাকি প্রচেষ্টা
মোসা: সেলিনা খাতুন
সামগ্রিকভাবে কোন জাতির উন্নতি করতে চাইলে শিক্ষার প্রতি গুরুত্বারোপ করার কোন বিকল্প নেই। শিক্ষা নামক এই মৌলিক চাহিদার পূর্ণতা না পেলে দেশ ও জাতির উন্নয়ন কোনভাবেই সম্ভব নয়। কৃষিখাত থেকে শুরু করে শিল্প, বানিজ্য, গবেষনা, আবিষ্কার প্রতিটি বিষয়েই শিক্ষার অপরিহার্যতা অনস্বীকার্য। সেকেলে যুগের মত শুধু বর্ণজ্ঞান বা সনদ অর্জন করেই দায় সারা পড়ালেখা নয় বরং যুগোপযোগী বাস্তব ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করণে বর্তমানে গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে। মানসম্মত শিক্ষা হলো- শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, দক্ষতা, দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধকে উন্নত করার জন্য এক ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা। যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন পর্যায়ে অর্জিত জ্ঞানকে সঠিকভাবে ব্যবহার করার পাশাপাশি সমাজে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারে। আর মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য শুধুমাত্র ক্লাসরুম বা গতানুগতিক শিক্ষার্জনই যথেষ্ট নয়। মানসম্মত শিক্ষা শিক্ষার্থীর মূল্যবোধ ও আচরণের ইতিবাচক পরিবর্তন করে তার মনোজগতের পরিবর্তনের আকাঙ্খা তৈরি করে। একই সাথে তাদের চেতনার পরিবর্তন ঘটায়। অনুসন্ধিৎসু ও বিজ্ঞান মনোস্ক করে তোলে। শিক্ষার্থীরা তাদের জ্ঞান, দক্ষতা, দৃষ্টিভঙ্গি, মুগোপযোগী মূল্যবোধ গঠন, পুনর্গঠনে নিজেকে দক্ষ করে গড়ে তোলে। নিজের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা তৈরি হয়। যা মানব সম্পদ উন্নয়নের অন্যতম স্তম্ভ। জ্ঞান বিজ্ঞানের এই যুগে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা শিক্ষার্থীর ব্যক্তি ও সামাজিক পরিবর্তন অগ্রগতি ও রূপান্তরের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। এতে তার সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটে। নিজে বিকশিত হতে শেখে এবং সু-অভ্যাস গঠিত হয়। একজন শিক্ষার্থী প্রাথমিক শিক্ষার্জনের পর এমন জ্ঞান দক্ষতা, মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করবে যা তার ব্যক্তিজীবনে বিভিন্ন সমস্যা-সমাধানে ও উন্নত জীবন যাপনের সহায়তা করবে। প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা সমাপ্তির পর যদি কোন শিক্ষার্থীর পড়ালেখার আর সুযোগ না হয়, সেক্ষেত্রে যেন ঐ শিক্ষার্থী তার অর্জিত জ্ঞান কাজে লাগিয়ে সুন্দরভাবে জীবন পরিচালনা করতে পারে। বর্তমান শিক্ষাক্রমেও ঠিক এমন বিষয়েই গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ শিক্ষকের মাধ্যমে প্রাথমিক স্তরে আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় শিশুর মেধা বিকাশে সর্বোচ্চ শক্তিসম্মত কাজ হবে বলে মনে করি। একটি শিশুর জীবনের বেশির ভাগ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় কাটে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রস্তুতি নেওয়া শিশুটি প্রায় সন্ধ্যা পর্যন্ত শিক্ষকদের সান্নিধ্যে প্রতিষ্ঠানেই কাটায়। তাই বলা যায়, শিক্ষকই তার জীবনের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব এবং শুধু শিক্ষাদানই নয়, একজন দায়িত্বশীল অভিভাবক হিসেবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে থাকেন। মানসম্মত শিল্প বাস্তবায়নে শিক্ষকদের পাশাপাশি অভিভাবকদের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা শুধু মানসম্মত শিক্ষাই নিশ্চিত করেনা, তাদের সামগ্রিক বিকাশও ঘটায়।

অভিভাবকের সজ্ঞায় বলা হয়েছে: অভিভাবক হলো এমন একজন ব্যক্তি যিনি কারো দেখাশোনা করার, তাদের সম্পত্তির তত্ত্বাবধান বা তাদের আইনি সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রাখেন। সে হিসাবে বাবা-মা সহ পরিবারের যে কেউই অভিভাবক হতে পারে। একজন অভিভাবক হিসাবে শিশুর মনোবল ও আগ্রহ তৈরিতে শিক্ষকদের পাশাপাশি অভিভাবকগণও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীল ভুমিকা পালন করে থাকেন। সন্তানের পড়াশোনায় আগ্রহ তৈরিতে অভিভাবকগন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। ব্যস্ততার মধ্যেও। নিজের সন্তানের জন্য দেওয়া সময় বের করা জরুরী। কারন এই সন্তানই আমাদের জীবনের সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ও গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। অনেক মা সন্তানকে পড়তে বসিয়ে নিজে টিভি কিংবা মোবাইল পর্দায় নজর রাখেন বা সাংসারিক কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এতে শিশু শরীরিকভাবে পড়ালেখায় থাকলেও মনযোগ দিতে পারেনা। কিন্তু অভিভাবক যদি নিজে একটি বই নিয়ে সন্তানের পাশে বসেন তাহলে সন্তান মনে করে যে, শুধু এটা তার একারই কাজ নয়। তারা মনে করে সবার কাজে এটাই নিয়ম। আর এটি তার মনে একটি ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে। পড়াশুনা না করে সন্তানের পাশে বসে থেকেও তার মনোযোগ আকর্ষন করা যায়। গাছ রোপনের পরে নিয়মিত পরিচর্যা না করলে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যেমন সম্ভব নয়, তেমনি সন্তানের পড়ালেখার নিয়মিত খোঁজ-খবর না রেখে তার কাছ থেকেও ভালো ফল প্রত্যাশা করাও সম্ভব নয়। শিশু সন্তানকে বকাঝকা করা বা শারীরিক প্রহার করলে শিশু হীনমন্যতায় ভোগে এবং আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। তাই তাদের সাথে নেতিবাচক আচরণ না করে ইতিবাচক মনোভাব পোষন করা। শিক্ষকদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করা এবং সন্তানের সবল-দূর্বলতার প্রতি নজর দিয়ে সফলতার দারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়ার চেষ্ঠা করা একান্ত দায়িত্ব।

শিশুর সাথে কিংবা সামনে চিৎকার-চেঁচামেচি করলে তার মস্তিষ্কে কার্টিসল নামক স্ট্রেস হরমোন বেড়ে যায়। ফলে তার মনে জন্ম নেয় ভয়, চাপ এবং হীনমন্যতা। এরূপ পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুরা সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে এবং তাদের সৃজনশীলতাও হ্রাস পায়। অন্যদিকে, দৃঢ় পারিবারিক বন্ধন, পারস্পরিক শ্রোদ্ধাবোধ সহনশীল ও উত্তম আচরনের মধ্যে বেড়ে ওঠার শিশুর মস্তিষ্ক থেকে অক্সিটোসিন ও ডোপামিন (ফিল গুড) হরমোন নিঃসৃত হয়। যা শিশুর আত্মবিশ^াস, নিরাপত্তাবোধ, ইতিবাচক মনোভাব, শেখার প্রতি আগ্রহ ও সৃজনশীলতা বৃদ্ধি করে। তাই অভিভাবকগনের উচিৎ শিশুর জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা। সন্তানের জন্য শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়মিতভাবে পরোক্ষ করাও অভিভাবকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। শিশুকে পুষ্টিকর খাবার ও সময়মত ঘুম ও প্রকৃতির সাথে মেশা নিশ্চিত করতে পারাটাও শিশুর মানসিক চাপ কমাতে ও তাদের বন্ধুসুলভ আচরণ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। বাড়ি থেকে বিদ্যালয়, সবার উদ্দেশ্য হলো: শিশুকে একজন বাস্তব জ্ঞান সম্মত সম্পন্ন যোগ্য ও দক্ষ জনসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলা। কোন একক অভিভাবক হিসেবে এই গুরুদায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়। আর শিশুরা যেহেতু শিক্ষকদের অধিক সম্মান ও গুরুত্ব দিয়ে থাকে তাই পারিবারিক অভিভাবকগণকে সার্বিক বিষয়ে শিক্ষকদেরকে সহযোগিতা করতে হবে। প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকগণ শুধু শিক্ষার্থীদের ঋড়ৎসধষ আচরণই দেখে থাকেন। কিন্তু বাবা-মা/পরিবার ওহভড়ৎসধষ ও বাস্তব আচরন দেখেন। তাই এই দুই ধরনের আচরণ বা মানসিকতার মিশ্রণ ঘটিয়ে শিশুর চাহিদানুযায়ী মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করণে শিক্ষক-অভিভাবক সম্পর্কোন্নয়ন বা যোগাযোগের কোন বিকল্প নাই।

পরিশেষে, মানসম্মত শিক্ষা বাস্তবায়নে অভিভাবকের দায়িত্ব শুধু সন্তানের লেখা-পড়ার খরচ বহন করা বা খাবার নিশ্চিত করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং তাদের জীবনের প্রতিটি ধাপে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকা। শিক্ষকবৃন্দের পাশা-পাশি অভিভাবকগনের সচেতনতা, আগ্রহ ও সক্রিয় অংশ গ্রহণই পারে একটি শিশুকে জ্ঞান, দক্ষতা, ইতিবাচক, দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধ সম্পন্ন মূল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে। তাই শুধু প্রত্যাশা করে বসে থাকা নয় বরং তীব্রতর প্রচেষ্ঠায় শিশুমনকে জয়করে কাঙ্খিক্ষিত ফল অর্জনে শিক্ষক-অভিভাবক সবাইকে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী, শিক্ষক-অভিভাবক এবং শিশু/শিক্ষার্থী-অভিভাবক সম্পর্কোন্নয়ন ঘটাতে হবে।

লেখক: শিক্ষক
 

সম্পর্কিত খবর

আস্থার সঙ্কটে চিকিৎসাব্যবস্থা

আস্থার সঙ্কটে চিকিৎসাব্যবস্থা

ডেঙ্গু কেবল রোগ নয়, জনস্বাস্থ্য-নিরাপত্তার ইস্যু

ডেঙ্গু কেবল রোগ নয়, জনস্বাস্থ্য-নিরাপত্তার ইস্যু

শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র পে-স্কেল

শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র পে-স্কেল

কঠোর প্রয়োগ ছাড়া ধূমপান নিয়ন্ত্রণ আইন ফলদায়ক নয়

কঠোর প্রয়োগ ছাড়া ধূমপান নিয়ন্ত্রণ আইন ফলদায়ক নয়

ফটোগ্রাফি অত্যন্ত প্রভাবশালী শিল্পমাধ্যম

ফটোগ্রাফি অত্যন্ত প্রভাবশালী শিল্পমাধ্যম

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধে প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধে প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ

Logo

সম্পাদক : এস.এম জাহিদ আনোয়ার শামীম