Logo
Logo
×

সারাদেশ

ত্রিশালে ব্যাটারি পুড়িয়ে তৈরি হচ্ছে সিসা, হুমকিতে জনস্বাস্থ্য ও কৃষি

asif

asif

প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০০ পিএম

ত্রিশালে ব্যাটারি পুড়িয়ে তৈরি হচ্ছে সিসা, হুমকিতে জনস্বাস্থ্য ও কৃষি

 ময়মনসিংহ প্রতিনিধি-: একদিকে কৃষিজমি রক্ষায় নানা উদ্যোগ ও আইন প্রয়োগ করছে সরকার, অন্যদিকে ময়মনসিংহের ত্রিশালে কৃষিজমির বুকেই গড়ে উঠেছে পুরোনো ব্যাটারি পুড়িয়ে সিসা তৈরির দুটি কারখানা। উপজেলার হরিরামপুর ইউনিয়নের নিঘোরকান্দা এবং বৈলর ইউনিয়নের নামাপাড়া এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কসংলগ্ন কৃষিজমিতে এসব কারখানায় পুরোনো ব্যাটারি ভেঙে, অ্যাসিড ও অন্যান্য উপাদান আলাদা করে আগুনে পোড়ানোর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কারখানা দুটির কার্যক্রমের কারণে আশপাশের এলাকায় তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ ও ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ছে। এতে কৃষিজমি, ফসল, মাটি, পানি ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো-কারখানাগুলোর পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র ও ট্রেড লাইসেন্স নেই বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। রাতের আঁধারে ব্যাটারি পোড়ানোর অভিযোগসরেজমিনে নিঘোরকান্দা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, একটি ইটভাটার পাশে কৃষিজমি ভাড়া নিয়ে পুরোনো ব্যাটারি প্রক্রিয়াজাত করার কার্যক্রম চলছে। শ্রমিকরা পুরোনো ব্যাটারির বিভিন্ন অংশ খুলে আলাদা করছেন। কেউ ব্যাটারির খোলস ও প্লাস্টিক অংশ পৃথক করছেন, আবার কেউ ধাতব অংশ সংগ্রহ করছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, দিনের বেলায় ব্যাটারি ভাঙা ও বিভিন্ন উপাদান আলাদা করার কাজ চলে। পরে রাতে সেগুলো আগুনে পোড়ানো হয়। পোড়ানোর সময় তীব্র ধোঁয়া ও ঝাঁঝালো গন্ধে আশপাশের পরিবেশ দূষিত হয়ে পড়ে। বৈলর ইউনিয়নের নামাপাড়া এলাকার কারখানাতেও একই ধরনের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। সেখানে বিপুল পরিমাণ পুরোনো ব্যাটারি এনে প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, ব্যাটারি পোড়ানোর পর পাওয়া ধাতব পদার্থ ঘন করে বিভিন্ন ব্যাটারি তৈরির কারখানায় বিক্রি করা হয়। প্রায় অর্ধশত শ্রমিকের কাজস্থানীয় সূত্রের দাবি, কারখানা দুটির কার্যক্রমে প্রায় অর্ধশতাধিক শ্রমিক কোনো না কোনোভাবে যুক্ত। পুরোনো ব্যাটারি সংগ্রহ, ভাঙা, অ্যাসিড ও প্লাস্টিক আলাদা করা এবং ধাতব পদার্থ প্রক্রিয়াজাত করার কাজে তারা নিয়োজিত। তবে শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ব্যাটারির অ্যাসিড ও অন্যান্য রাসায়নিক পদার্থ নিয়ে কাজ করার সময় যথাযথ ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। ফসল নষ্টের শঙ্কা কৃষকদেরকারখানার আশপাশের কৃষকদের অভিযোগ, বিষাক্ত ধোঁয়া ও বর্জ্যরে কারণে জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে রাতের বেলায় ব্যাটারি পোড়ানোর সময় দুর্গন্ধ ও ধোঁয়া বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দা নাহিদ বলেন, ‘দিনের বেলায় ব্যাটারির অ্যাসিডমিশ্রিত সিসা ও প্লাস্টিক আলাদা করা হয়। শুনেছি, রাতে এগুলো পোড়ানো হয়। তখন প্রচুর ধোঁয়া ও ঝাঁঝালো গন্ধ বের হয়। এতে আশপাশের পরিবেশ ও ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কয়েকবার নিষেধ করেছি, বন্ধ হয়নি।’ স্থানীয় ইউপি সদস্য ছাইফুল ইসলাম ফরাজী বলেন, ‘কয়েক মাস আগে কৃষিজমিতে পুরোনো ব্যাটারি পুড়িয়ে সিসা তৈরির কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে। দিনে ব্যাটারি সংগ্রহ করা হয়, আর রাতে সেগুলো পোড়ানো হয়। অ্যাসিড ও পুরোনো ব্যাটারি পোড়ানোর কারণে ঝাঁঝালো গন্ধে গোটা এলাকা ভরে যায়। আমি কয়েকবার তাদের নিষেধ করেছি। তারপরও তারা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।’ ট্রেড লাইসেন্স নেয়নি কারখানাহরিরামপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক শামসুজ্জামান মাসুম বলেন, ‘সিসা কারখানার বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। এটি ইউনিয়ন পরিষদ থেকে কোনো ট্রেড লাইসেন্স গ্রহণ করেনি। তবে বিষয়টি নিয়ে এলাকার কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। নিঘোরকান্দা এলাকার সিসা কারখানার ম্যানেজার আবুল কালাম বলেন, ‘এটা বৈধ না। আমরা অনুমোদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের চেষ্টা করছি। এখনো অনুমোদন পাইনি। তবে এতে কোনো ক্ষতি হয় না।’ এলাকার মানুষের সঙ্গে সমঝোতা করেই ব্যবসা পরিচালনার বিষয়েও তিনি মন্তব্য করেন। অন্যদিকে বৈলর ইউনিয়নের কারখানার মালিক বিল্লাল বলেন, ‘ভাই, এটা নিয়ে নিউজ করতে হবে না।’ বৈধ কাগজপত্র আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কৃষিজমিতে সরকার এ ধরনের কারখানার অনুমোদন দেয় না। নিউজ করতে হবে না, সন্ধ্যার পর আপনার সঙ্গে দেখা করব।’ কৃষি জমিতে সিসা-অ্যাসিড, ভয়াবহ ক্ষতির আশঙ্কাত্রিশাল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হাম্মিম জাহান বলেন, ‘কৃষিজমিতে সিসা ও অ্যাসিড পোড়ানো বা ফেলার ফলে ফসলের ভয়াবহ দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হতে পারে। এতে মাটির উর্বরতা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদিত ফসল মানুষের খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।’ বন্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ^াসত্রিশাল উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘বিষয়টি অবগত হয়েছি। ওই অবৈধ কারখানা বন্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ পরিবেশ অধিদপ্তর ময়মনসিংহ বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক শেখ মো. নাজমুল হুদা বলেন, ‘সিসা তৈরির কারখানা দুটি অবৈধ। তাদের কোনো ছাড়পত্র নেই। সিসা তৈরির কারখানা বন্ধের জন্য দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ আইন কী বলেপরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা আইনগতভাবে দ-নীয় হতে পারে। একই সঙ্গে কৃষিজমির ব্যবহার পরিবর্তন, শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশে দূষণ ছড়ানোর ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধিমালা প্রযোজ্য। বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরোনো সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারি অনিয়ন্ত্রিতভাবে ভাঙা ও পোড়ানোর ফলে সীসা, অ্যাসিড ও অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদান বায়ু, মাটি ও পানিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এসব দূষণ দীর্ঘমেয়াদে কৃষি, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। দাবি তদন্তেরস্থানীয় কৃষক ও বাসিন্দাদের দাবি, কৃষিজমি ও জনবসতির পাশে অনুমোদনহীনভাবে পরিচালিত কারখানা দুটির কার্যক্রম দ্রুত বন্ধ করা হোক। পাশাপাশি পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ, কারখানার বর্জ্য ও দূষিত মাটি পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। এখন দেখার বিষয়কর্তৃপক্ষের দেওয়া দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ^াস বাস্তবে কতটা কার্যকর হয় এবং কৃষিজমির বুক থেকে এই ‘বিষের কারখানা’ আদৌ সরানো হয় কি না। 

সম্পর্কিত খবর

ফুলবাড়িয়ায় জুয়াড়ি ও মাদক কারবারিসহ ১৮ জন পুলিশের জালে

ফুলবাড়িয়ায় জুয়াড়ি ও মাদক কারবারিসহ ১৮ জন পুলিশের জালে

চাটমোহরে দুই ফার্মেসিকে ৩৩ হাজার টাকা জরিমানা

চাটমোহরে দুই ফার্মেসিকে ৩৩ হাজার টাকা জরিমানা

গাইবান্ধায় পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় চালকসহ ২ জন নিহত, আহত ১০

গাইবান্ধায় পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় চালকসহ ২ জন নিহত, আহত ১০

মতলব উত্তরে ডোবায় পড়ে শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু

মতলব উত্তরে ডোবায় পড়ে শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু

ভগ্নিপতির লাশ পৌঁছে দিতে গিয়ে কাপাসিয়ার স্কুলশিক্ষিকার মৃত্যু

ভগ্নিপতির লাশ পৌঁছে দিতে গিয়ে কাপাসিয়ার স্কুলশিক্ষিকার মৃত্যু

গফরগাঁওয়ে ৫ দোকানে আগুন, ২৫ লাখ টাকার ক্ষতি

গফরগাঁওয়ে ৫ দোকানে আগুন, ২৫ লাখ টাকার ক্ষতি

Logo

সম্পাদক : এস.এম জাহিদ আনোয়ার শামীম