সামাজিক অবক্ষয় সহিংসতা কি স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে?
asif
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:১৪ পিএম
একটি সমাজের জন্য সবচেয়ে অশনিসংকেত হলো যখন সহিংসতা আর ব্যতিক্রমী না থেকে ধীরে ধীরে দৈনন্দিন ঘটনায় পরিণত হয়। মানুষ যখন খুন, নির্যাতন, ধর্ষণ, পারিবারিক হত্যাকা- কিংবা কিশোরদের নৃশংস অপরাধের খবর শুনে আর বিস্মিত হয় না, তখন বুঝতে হবে সংকট শুধু আইনশৃঙ্খলার নয়, সমাজের আত্মার ভেতরেও ঘা ধরেছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া নির্মম ঘটনাগুলো সেই উদ্বেগকেই সামনে নিয়ে এসেছে। তুচ্ছ কারণকে কেন্দ্র করে হত্যাকা-, পারিবারিক বিরোধের জেরে শিশুদের মৃত্যুর ঘটনা, যৌন সহিংসতা কিংবা অপহরণের মতো অপরাধের ক্রমবৃদ্ধি দেখাচ্ছে যে সামাজিক সংযম ও মানবিক মূল্যবোধের জায়গাটি ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। অপরাধ কখনো হঠাৎ করে বাড়ে না। এর পেছনে থাকে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, বিচারহীনতা, সামাজিক অবক্ষয় এবং আইনের দুর্বল প্রয়োগ। যখন মানুষ দেখে গুরুতর অপরাধের বিচার বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, যখন প্রভাবশালীরা আইনের ঊর্ধ্বে অবস্থান করে, যখন অপরাধ করে পার পাওয়ার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে, তখন অপরাধীর মন থেকে শাস্তির ভয় দূর হয়ে যায়। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যেও আইনের প্রতি আস্থা কমতে থাকে। এর ফলাফল হিসেবে সমাজে প্রতিহিংসা, অসহিষ্ণুতা এবং আক্রমণাত্মক আচরণ বাড়তে থাকে। বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয় হলো, সহিংসতার সঙ্গে তরুণ ও কিশোরদের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি। কিশোর গ্যাং, মাদক, অনলাইন অপরাধ এবং সহজে অর্থ উপার্জনের বিকৃত মানসিকতা তরুণদের একটি অংশকে অপরাধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। পরিবারে সময়ের অভাব, সামাজিক তদারকির ঘাটতি এবং শিক্ষাঙ্গনে মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষার দুর্বলতা এ সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। একটি প্রজন্ম যদি মানবিকতা ও দায়িত্ববোধের পরিবর্তে সহিংসতা ও দ্রুত লাভের সংস্কৃতির মধ্যে বেড়ে ওঠে, তাহলে ভবিষ্যৎ সমাজ আরও অনিরাপদ হয়ে উঠবে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য শুধু পুলিশি অভিযান যথেষ্ট নয়। অপরাধ সংঘটনের পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অপরাধ জন্ম নেওয়ার কারণগুলোও দূর করতে হবে। দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা, মাদক ও কিশোর অপরাধ দমনে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া এবং স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক নজরদারি জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে মানবিকতা, সহনশীলতা এবং নৈতিক মূল্যবোধ পুনর্গঠনের কাজে আরও সক্রিয় হতে হবে। আমরা মনে করি, একটি সভ্য সমাজ শুধু আইন দিয়ে টিকে থাকে না; টিকে থাকে ন্যায়বিচার, মানবিকতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ওপর। মানুষের জীবনের মূল্য যদি সামাজিকভাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত না করা যায়, তাহলে অপরাধ দমন করেও স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। তাই সময় এসেছে সহিংসতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় কঠোরতা এবং সামাজিক প্রতিরোধকে একসঙ্গে শক্তিশালী করার। তা না হলে অপরাধের এই অন্ধকার চক্র সমাজকে আরও গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দেবে।
