Logo
Logo
×

সাহিত্য

তালগাছের ভূতের কাহিনী

asif

asif

প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৫৩ পিএম

তালগাছের ভূতের কাহিনী

তালগাছের ভূতের কাহিনী
মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
গ্রামের নামটা বড় চেনা চেনা-তিতাস নদীর পাড় ঘেঁষে বিস্তৃত সবুজ মাঠ আর তালগাছের সারি যেন গ্রামটার সৌন্দর্যকে এক আলাদা মাত্রা দিয়েছে। এই গ্রামেই থাকে শুভ, আবুল, স্বপন আর আলম। ওরা চারজন যেন এক আত্মার চারটি অংশ-শৈশব থেকে একসাথে খেলা, নদীতে সাঁতার কাটা, আর রাতে দল বেঁধে কীর্তনের মেলা দেখতে যাওয়া। কিন্তু তাদের একটা বিশেষ খ্যাতি আছে, যা নিয়ে আত্মীয়স্বজন হাসাহাসি করে আবার ভয়ে ভয়ে সহ্যও করে। খ্যাতিটা হলো-ওরা মৌসুমি ফলের চোর। তবে গ্রামের বাইরে বা অন্য কারো বাগান নয়-শুধু নিজেদের আর আত্মীয়-স্বজনদের ফল চুরি করে। যেন এক অদ্ভুত নিয়ম মেনে তারা এই অভ্যাস চালিয়ে যাচ্ছে।

কেউ যদি জিজ্ঞেস করত-“তোমরা কেন অন্যের ফল চুরি করো না?”
শুভ হাসিমুখে উত্তর দিত, “অন্যেরটা নিলে পাপ হবে। আত্মীয়েরটা নিলে সেটা ভাগাভাগি।”

এমন উত্তর শুনে অনেকে হাসত, অনেকে আবার চোখ রাঙাত। কিন্তু শেষমেশ আত্মীয়রা সেটা হালকাভাবে মেনে নিত, কারণ ওদের চুরিবিদ্যা ছিল অদ্ভুত-চোখের পলকে গাছ খালি করে দিত, অথচ কখনো ভাঙচুর করত না।

সেই রাতটা ছিল ভরা জ্যোৎ¯œার রাত। আকাশজুড়ে উজ্জ্বল চাঁদ, তালগাছগুলোর ছায়া যেন দীর্ঘ হাত বাড়িয়ে দিয়েছে মাটির বুকে। শুভ, আবুল, স্বপন, আলম, মোশারফ, কবির আর আরো কয়েকজন জড়ো হয়েছিল খলিল কাকার উঠানে। কারণ, আজকে মহরম দাদা গ্রাম-প্রখ্যাত কিচ্ছা-কথক। তার কণ্ঠে ভূতের গল্প শুনতে শুনতে গ্রামের মানুষ রাত কাটিয়ে দিত। ছেলেপুলেরা তাকে ঘিরে রাখত, বয়স্করাও আড্ডায় মিশে যেত।

সবাই যখন মহরম দাদার গল্পে ডুবে আছে, তখন হঠাৎ খলিল কাকা তালগাছের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠলেন। তার চিৎকার এত ভয়ঙ্কর ছিল যে সবাই আঁতকে উঠল। তারপর আর দাঁড়াতে না পেরে তিনি সোজা মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। উঠোনের পরিবেশ মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেল। শিশুরা কেঁদে উঠল, মহিলারা দৌড়ে আসতে লাগল।

শুভরা ছুটে গেল কাকার কাছে। কারো হাতে পানি, কারো মুখে দোয়া-দরুদ। হুজুর এসে ফুঁ দিয়ে পড়তে লাগলেন। কিছুক্ষণ পর খলিল কাকার চোখে আলো ফিরল। সবাই হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। কিন্তু তার কণ্ঠে তখনো কাঁপুনি-“তালগাছেৃ তালগাছে দশ হাত লম্বা মানুষটা উঠতেছেৃ।”

শুনে সবাই একে অপরের দিকে তাকাল। কারো চোখে বিস্ময়, কারো চোখে আতঙ্ক। খলিল কাকার কথা শেষ হতে না হতেই তিনি আবার বললেন- “তারপর কে কে বলার কারণে শয়তানটা আমাকে চপোটাঘাত করে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। তারপর আমি কিছুই মনে করতে পারি নাই।”

এমন বর্ণনায় ভয়ে সবার গা শিরশির করে উঠল। মহরম দাদার কিচ্ছা যেন হার মেনে গেল এই ঘটনাটার কাছে। একে একে সবাই দরুদ-দোয়া পড়তে পড়তে নিজের ঘরে ফিরে গেল। আর রাতভর গ্রামের তালগাছগুলো বাতাসে দুলতে দুলতে যেন অদ্ভুত শব্দ করছিল, কেউ কেউ মনে করল-ওটা আসলে ভূতের হাঁসি।

তারপর থেকে খলিল কাকার উঠোনের তালগাছের কাছে আর কেউ যায় না। বিশেষ করে রাতে তো নয়ই। শিশুদের খেলার জায়গা বদলে গেল, মহিলারা ওদিক দিয়ে যাওয়া বন্ধ করে দিল। এমনকি মৌসুমি ফলের মৌসুমেও কেউ তাল পাড়তে সাহস করল না। শুভ-আবুলরাও একবার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু মনে হচ্ছিল গাছের মাথায় কেউ তাকিয়ে আছে।

ঠিক এক বছর পরে, ভরা বর্ষার দিনে খলিল কাকা শুভকে ডেকে নিলেন। গোপনে, যেন কেউ না শোনে। কাকা তখন শান্ত হাসি হেসে বললেন- “শোন শুভ, ওইদিন যদি আমি ভূতের কাহিনী না বানাতাম, তবে একটা তালও তুমি খেতে পারতে না। সব আলমদের দখলে চলে যেত।”

শুভ হতভম্ব হয়ে বললো, “মানে কাকা? আপনি কি ভূত দেখেন নাই?”

খলিল কাকা হেসে বললেন, “ভূত তো আমি জীবনে দেখি নাই। কিন্তু তোমাদের এই ফল চুরির খেলা আমি অনেক দিন দেখেছি। আলমরা ঠিক করেছিল ওই রাতেই গাছ খালি করবে। আমি মহরম দাদার গল্পের সাথে মিশিয়ে একটু ভয় দেখালাম। সবাই ভয়ে পালিয়ে গেল। তারপর থেকে কেউ ওই গাছে ওঠেনি। তুমি তাই তাল খেয়ে বেঁচেছো।”

শুভ একচোট হেসে উঠল। কিন্তু হাসির ভেতর এক অদ্ভুত বেদনা মিশে গেল। সে ভাবল, মানুষ আসলে কত সহজে ভয়ের কাছে পরাজিত হয়! একটুখানি কল্পনা, আর একটু আতঙ্ক-এই মিশ্রণেই পুরো গ্রাম তালগাছ এড়িয়ে চলে গেল। অথচ সত্যিটা ছিল বড় সাধারণ-কাকার কৌশল।

কিন্তু এই কাহিনী তবুও গ্রামে ছড়িয়ে গেল অন্য রূপে। কেউ বলল, “খলিল কাকা আসল ভূত দেখেছে।” কেউ বলল, “তালগাছে রাক্ষস থাকে।” আবার কেউ কেউ ফিসফিস করে বলল, “গাছের ছায়ায় জিন থাকে।” বছর ঘুরে গেল, কিন্তু তালগাছের ছায়া যেন রহস্যে ঢেকে রইল।

শুভরা এরপরও চুরির নেশা ছাড়ল না। তবে সেই রাতে খলিল কাকার কথা তাদের মনে এক অদ্ভুত শিক্ষা রেখে গেল। তারা বুঝল, চুরি করার সাহস থাকলেও ভয়ের কাছে মানুষ কতটা দুর্বল। আলম যেই তালগাছকে নিজের দখলে নিতে চেয়েছিল, সেই গাছই পরে গ্রামের মানুষের কাছে ভূতের প্রতীক হয়ে গেল।

আর খলিল কাকা? তিনি মাঝে মাঝে উঠোনে বসে তালগাছের দিকে তাকিয়ে হাসতেন। গ্রামের মানুষ ভেবে নিতেন-তিনি হয়তো ভূতের কথা মনে করছেন। কিন্তু শুভ জানত-হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গোপন বুদ্ধি, যা দিয়ে কাকা একরাতে পুরো গ্রামকে বশ করেছিলেন।

তালগাছটা আজো আছে। জ্যোৎ¯œা রাতে যখন বাতাস বয়ে যায়, তখন পাতার ফাঁকে ফাঁকে অদ্ভুত শব্দ ওঠে। নতুন প্রজন্মের ছেলেপুলেরা গল্প শোনে-“ওই গাছে একবার দশ হাত লম্বা ভূত উঠেছিল।” কেউ বিশ^াস করে, কেউ করে না। কিন্তু গ্রামে এখনও অঘোষিত নিয়ম আছে-ওই তালগাছের ফল কেউ পাড়ে না।

শুভর মনে মাঝে মাঝে প্রশ্ন জাগে-সত্যিই কি ভূত ছিল? নাকি সবটাই খলিল কাকার নাটক? আর এই প্রশ্নই তাকে প্রতি পূর্ণিমায় টেনে নিয়ে যায় গাছটার কাছে, যেখানে সে দাঁড়িয়ে চাঁদের আলোয় দেখে-তালগাছের মাথায় সত্যিই কি কেউ দুলছে, নাকি ওটা কেবল বাতাসের খেলা?
 

সম্পর্কিত খবর

র‌্যামেসিস রা-এর রক্তধারা

র‌্যামেসিস রা-এর রক্তধারা

গরমে আবার শরম

গরমে আবার শরম

জীবনবোধ

জীবনবোধ

র‌্যামেসিস রা-এর রক্তধারা

র‌্যামেসিস রা-এর রক্তধারা

জীবনবোধ

জীবনবোধ

গরমে আবার শরম

গরমে আবার শরম

Logo

সম্পাদক : এস.এম জাহিদ আনোয়ার শামীম