ইলিশ শুধু একটি মাছ নয়, বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতি, আবেগ ও ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা একটি নাম। বর্ষা এলেই ইলিশের কথা মনে পড়ে। পদ্মা-মেঘনার ইলিশ ঘিরে তৈরি হয়েছে দীর্ঘদিনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। পহেলা বৈশাখের পান্তা-ইলিশ, পূজা কিংবা জামাইষষ্ঠীর মতো আয়োজনেও ইলিশের উপস্থিতি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। চাঁদপুরকে বলা হয় ইলিশের রাজধানী, আর পদ্মার ইলিশের রয়েছে আলাদা কদর। অথচ সেই দেশীয় ইলিশই এখন নানা সংকটে। একদিকে কমছে প্রাপ্যতা, অন্যদিকে বাড়ছে দাম। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদেশি ইলিশের আমদানি। ফলে প্রশ্ন উঠছে, দেশের মানুষের প্রিয় এই মাছটির ভবিষ্যৎ কোন পথে?
ইলিশের বাজারের বর্তমান চিত্র খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। কয়েক বছর আগেও যে পরিমাণ ইলিশ বাজারে দেখা যেত, এখন তার তুলনায় সরবরাহ অনেক কম বলে সংশ্লিষ্টদের তথ্য থেকে জানা যায়। মাছ ধরার নৌকা একসময় গড়ে ২০০ থেকে ২৫০ মণ ইলিশ নিয়ে ফিরত। এখন অনেক ক্ষেত্রে তা নেমে এসেছে ৩০ থেকে ৫০ মণে। চাঁদপুরে মৌসুমে যেখানে দুই-তিন বছর আগেও প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার মণ ইলিশ বিক্রি হতো, সেখানে এখন বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২৫০ মণ।
এই সংকটের পেছনে একাধিক কারণের কথা উঠে এসেছে। নদীদূষণ, নদী ভরাট, চর জেগে ওঠা, প্রজননক্ষেত্র সংকুচিত হওয়া, জাটকা নিধন এবং নদীর স্বাভাবিক পরিবেশের পরিবর্তন ইলিশের উৎপাদন ও বিচরণে প্রভাব ফেলছে। ফারাক্কার প্রভাবের কথাও বলা হয়েছে। ফলে শুধু জাটকা নিধন বন্ধ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। ইলিশের প্রজনন ও বিচরণের পুরো পরিবেশটিকেই সুরক্ষিত করতে হবে।
অন্যদিকে ইলিশের দাম বেড়েছে উদ্বেগজনকভাবে। দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে এক কেজি ইলিশের গড় দাম ছিল প্রায় ১ হাজার ২০০ টাকা। ২০২৪ সালে তা ছিল প্রায় ১ হাজার ১৫০ টাকা। একই সময়ে ১ থেকে দেড় কেজি ওজনের ইলিশের দাম ছিল ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা। ২০২৫ সালে একই আকারের ইলিশের দাম বেড়ে পাইকারিতে ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা এবং খুচরা পর্যায়ে ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৪০০ টাকায় পৌঁছায়। অর্থাৎ ইলিশ এখন শুধু সংকটের মাছ নয়, বহু মানুষের নাগালের বাইরেও চলে যাচ্ছে।
এ অবস্থায় বিদেশি ইলিশের আমদানি নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। ভারতের ইলিশ বাংলাদেশে আসছে, আবার সেই ইলিশ বাজারে দেশি ইলিশের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে ভারত থেকে ১ হাজার ৭৩৯ দশমিক ৫০ মেট্রিক টন ইলিশ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বেনাপোল দিয়ে ৫৩৫ মেট্রিক টন ইলিশ দেশে প্রবেশ করেছে।
এরপর মৎস্য অধিদপ্তর ১০৩টি অনাপত্তিপত্র বা ঘঙঈ বাতিল করেছে। ২২ সেপ্টেম্বর তারিখের চিঠিতে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয় এবং ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে ভারতীয় ইলিশের আমদানি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। বেনাপোল স্থলবন্দরেও ভারতীয় ইলিশের সরবরাহ বন্ধ হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের ফলে আমদানিকারকদের একটি অংশ আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ তুলেছেন। তাদের বক্তব্য, আগেই ভারতে ইলিশ কেনার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল বা মাছ কেনা হয়েছিল। হঠাৎ ঘঙঈ বাতিল হওয়ায় তাদের বিনিয়োগ ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। আমদানিকারকদের দাবি, ভারত থেকে আমদানি করা ইলিশের ঘোষিত মূল্য ছিল কেজিপ্রতি ৪৮ সেন্ট থেকে ২ ডলার। প্রয়োজনীয় শুল্ক-কর পরিশোধের পর এসব মাছ খালাস করা হয়েছে।
তবে এনওসি বা অনাপত্তি সনদ বাতিলের সরকারি কারণ চিঠিতে স্পষ্ট করা হয়নি। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে নানা আলোচনা রয়েছে। কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, আমদানি করা ইলিশকে দেশি বা পদ্মার ইলিশ হিসেবে বিক্রি করা হতে পারে। আবার আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অর্থপাচারের সুযোগ তৈরি হওয়ার আশঙ্কার কথাও কেউ কেউ বলেছেন। এসব অবশ্য সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা ও বক্তব্য; এগুলোকে সরকারি সিদ্ধান্তের প্রমাণিত কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, বিদেশি ইলিশের ওপর নির্ভরতা দেশীয় জেলেদের ওপর কী প্রভাব ফেলছে। দেশীয় ইলিশের উৎপাদন যখন নানা কারণে চাপে, তখন বাজারে বিদেশি ইলিশের সরবরাহ বাড়লে স্থানীয় জেলেদের মাছ ধরার আগ্রহ কমতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করেছেন। বিশেষ করে যারা দাদন নিয়ে মাছ ধরেন, তারা পর্যাপ্ত মাছ না পেলে ঋণ পরিশোধ করতে পারেন না। ফলে ইলিশের সংকট শুধু ভোক্তার সমস্যা নয়; এটি জেলে পরিবারের জীবিকা ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত।
তার ওপর বাজার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও কম গুরুতর নয়। ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, কিছু কোম্পানি বড় পরিমাণে ইলিশ কিনে গভীর হিমাগারে সংরক্ষণ করে এবং সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বাজারে একটি নির্দিষ্ট দামের নিচে মাছ বিক্রি না করার পরিস্থিতি তৈরি করে। এমন অভিযোগ সত্য হলে বাজারে ইলিশের দাম বাড়ার ক্ষেত্রে মজুত ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সবচেয়ে বড় কথা, ইলিশের সংকটকে কেবল বাজারদরের সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। নদী ও প্রজননক্ষেত্র রক্ষা না করে, জাটকা নিধন বন্ধ না করে, দূষণ কমানো ও ইলিশের বিচরণক্ষেত্র সংরক্ষণ না করে শুধু আমদানি করে বাজার সামাল দেওয়ার চেষ্টা দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হতে পারে না। আবার আমদানি বন্ধ করলেই দেশীয় বাজারে ইলিশের দাম কমে যাবে, এমন নিশ্চয়তাও নেই। উৎপাদন, সরবরাহ, মজুত, বাজারব্যবস্থা এবং ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা সব দিকই বিবেচনায় নিতে হবে।
দেশীয় ইলিশ রক্ষার দায়িত্ব শুধু মৎস্যজীবী বা মৎস্য অধিদপ্তরের নয়। নদী রক্ষা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ, জাটকা নিধন বন্ধ, জেলেদের দাদননির্ভরতা কমানো এবং বাজারে অস্বাভাবিক মজুত বা সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ খতিয়ে দেখা জরুরি। একই সঙ্গে আমদানির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে বিদেশি মাছ দেশি মাছ হিসেবে বাজারজাত করার সুযোগ না থাকে এবং আমদানিকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের অনিয়মের সুযোগ তৈরি না হয়।
ইলিশের সঙ্গে বাঙালির সম্পর্ক কেবল বাজারের হিসাব দিয়ে মাপা যায় না। কিন্তু ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে হলে উৎপাদন ও বাজারব্যবস্থার বাস্তব সমস্যাগুলোর সমাধান করতেই হবে। একদিকে দেশীয় ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে হবে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে দাম রাখার পথ খুঁজতে হবে।
আজকের অব্যবস্থাপনা যদি চলতেই থাকে, তাহলে ইলিশের সংকট আরও গভীর হতে পারে। যে মাছ একসময় নদী, জেলে ও সাধারণ মানুষের জীবনের স্বাভাবিক অংশ ছিল, সেটি যেন কেবল বিশেষ দিনের খাবার কিংবা স্মৃতির বিষয়ে পরিণত না হয়। স্বদেশী ইলিশকে বাঁচাতে হলে নদী বাঁচাতে হবে, জেলে বাঁচাতে হবে, প্রজননক্ষেত্র বাঁচাতে হবে এবং বাজারের অনিয়ম বন্ধ করতে হবে। ইলিশের ভবিষ্যৎ রক্ষায় এখনই সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
