Logo
Logo
×

উপসম্পাদকীয়

রাষ্ট্রীয় স্বার্থ বনাম পরাশক্তির প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভারসাম্যের চ্যালেঞ্জ পর্ব ১

asif

asif

প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৪৩ পিএম

রাষ্ট্রীয় স্বার্থ বনাম পরাশক্তির প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভারসাম্যের চ্যালেঞ্জ পর্ব ১

ড. মাহরুফ চৌধুরী
আন্তর্জাতিক রাজনীতির নির্মম বাস্তবতা হলো, পরাশক্তিগুলো কখনোই ছোট বা মাঝারি শক্তির রাষ্ট্রগুলোর প্রতি নিছক সৌজন্যবশত আগ্রহ দেখায় না। তাদের আগ্রহের কেন্দ্রে থাকে নিজস্ব অর্থনৈতিক, কৌশলগত, সামরিক কিংবা রাজনৈতিক স্বার্থ। কোনো বৃহৎ শক্তি যখন কোনো অপেক্ষাকৃত ছোট রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতে চায়, তখন সেই সম্পর্কের পেছনে অবশ্যই তার নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ, আঞ্চলিক হিসাব-নিকাশ এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত লক্ষ্য কাজ করে। একইভাবে ছোট বা মাঝারি রাষ্ট্রের জন্যও অন্য কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের মূল্য নির্ধারিত হওয়া উচিত সেই রাষ্ট্রের প্রতি আবেগ, ঐতিহাসিক ঘনিষ্ঠতা কিংবা সাময়িক রাজনৈতিক সুবিধার ভিত্তিতে নয়; বরং নিজের রাষ্ট্রীয় স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত ও অগ্রসর হচ্ছে, তার ভিত্তিতে। ফলে কোনো রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হলো অন্যদের স্বার্থের সংঘর্ষের মধ্যে নিজের জাতীয় স্বার্থকে কীভাবে সংরক্ষণ, সম্প্রসারণ এবং অগ্রসর করা যায়। আজকের বাংলাদেশও ঠিক এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।

বিগত কয়েক দশকে বিশ^ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক একমেরুকেন্দ্রিকতা থেকে ধীরে ধীরে বহুমেরুকেন্দ্রিকতার দিকে অগ্রসর হয়েছে। ¯œায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্য যে রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, বর্তমানে সেই কাঠামো ক্রমশ পরিবর্তিত হচ্ছে। চীনের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত উত্থান, ভারতের আঞ্চলিক প্রভাব বৃদ্ধি, রাশিয়ার কৌশলগত পুনরুত্থান এবং ইউরোপীয় শক্তিগুলোর নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ক্ষমতার বণ্টন ক্রমেই বহুকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সামুদ্রিক নিরাপত্তা, বাণিজ্যপথ, প্রযুক্তি, জ্বালানি, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে নতুন প্রতিযোগিতা। ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতি এখন এমন এক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে, যেখানে কোনো রাষ্ট্রের জন্য কেবল একটি শক্তির ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা ক্রমেই জটিল এবং কঠিন হয়ে উঠছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় দক্ষিণ এশিয়া ও বঙ্গোপসাগর অঞ্চল পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশের গুরুত্ব এখানে শুধু তার জনসংখ্যা, বাজার কিংবা অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কারণে নয়; এর ভৌগোলিক অবস্থানও তাকে এই প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করেছে। ভারত মহাসাগরীয় সামুদ্রিক যোগাযোগব্যবস্থা, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সম্ভাব্য স্থল ও নৌসংযোগ, বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক সম্পদ, আঞ্চলিক সরবরাহ শৃঙ্খল এবং চীনের সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার যোগাযোগ সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশের ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এখন শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পরিচালনার বিষয় নয়; বরং পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী বৃহৎ শক্তিগুলোর স্বার্থের মধ্য দিয়ে নিজের জন্য সর্বোচ্চ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিসর তৈরি করার একটি জটিল রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। বাংলাদেশের জন্য এই বাস্তবতা একই সঙ্গে সুযোগ এবং চ্যালেঞ্জ। সুযোগ এই কারণে যে, বহু শক্তির আগ্রহ একটি রাষ্ট্রকে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক দরকষাকষির ক্ষেত্র তৈরি করে দেয়। যখন একাধিক শক্তি কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতে আগ্রহী হয়, তখন সেই রাষ্ট্রের সামনে বিভিন্ন অংশীদারের কাছ থেকে উন্নয়ন সহযোগিতা, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, বাজারসুবিধা, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং কূটনৈতিক সমর্থন আদায়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

কিন্তু এই সুযোগ তখনই জাতীয় সম্পদে পরিণত হয়, যখন রাষ্ট্র তার নিজস্ব অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে পারে এবং প্রতিটি অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ককে সেই অগ্রাধিকারের আলোকে পরিচালনা করে। আবার চ্যালেঞ্জ এই কারণে যে, ভুল পদক্ষেপ রাষ্ট্রকে অন্যের প্রতিযোগিতার বলি বা প্রক্সিতে পরিণত করতে পারে। বৃহৎ শক্তির দ্বন্দ্বে ছোট রাষ্ট্র যদি নিজের নীতিগত স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলে, তাহলে তার ভূখ-, অর্থনীতি কিংবা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান অন্যের কৌশল বাস্তবায়নের ক্ষেত্র হয়ে ওঠার ঝুঁকি থাকে। অতএব বাংলাদেশের জন্য মূল প্রশ্ন কোনো পরাশক্তির পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া নয়; বরং কীভাবে পরাশক্তিগুলোর পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রতিযোগিতাকে নিজের জাতীয় স্বার্থে কাজে লাগিয়ে ফায়দা অর্জন করা যায় এবং একই সঙ্গে তাদের সংঘাত থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখা যায়।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তববাদী তত্ত্ব (রিয়েলিজম) রাষ্ট্রকে মূলত স্বার্থসর্বস্ব ও নিরাপত্তাকেন্দ্রিক সত্তা হিসেবে বিবেচনা করে (এ বিষয়ে আগের লেখায় কিছুটা আলোকপাত করা হয়েছে)। বাস্তববাদীদের মতে, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় কোনো কেন্দ্রীয় বিশ^ সরকার নেই; ফলে প্রতিটি রাষ্ট্রকে নিজের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং স্বার্থ নিজেকেই নিশ্চিত করতে হয়। এই ‘আন্তর্জাতিক নৈরাজ্য’ (ইন্টারন্যাশনাল অ্যানার্কি)-এর অর্থ বিশৃঙ্খলা নয়; বরং রাষ্ট্রগুলোর ওপর বাধ্যতামূলক কর্তৃত্ব প্রয়োগ করার মতো কোনো বৈশি^ক সর্বময় কর্তৃপক্ষের অনুপস্থিতি। ফলে বন্ধুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রও তার নিজস্ব স্বার্থের বাইরে গিয়ে অন্য রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করবে এমন নিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নেই। এ কারণেই পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে স্থায়ী আবেগের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ, রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা এবং কৌশলগত হিসাব-নিকাশকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

এই বাস্তবতায় ছোট রাষ্ট্রগুলোর সামনে সাধারণত তিনটি পথ খোলা থাকে ‘কোনো পরাশক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ জোটে আবদ্ধ হওয়া’ (ব্যান্ডওয়াগনিং); ‘প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির বিরুদ্ধে ভারসাম্য তৈরি করা (ব্যালেন্সিং); অথবা ‘পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর সঙ্গে একই সময়ে সম্পর্ক বজায় রেখে নিজের ঝুঁকি কমানো’ (হেজিং)। বাস্তবে কোনো রাষ্ট্র সবসময় একই কৌশল অনুসরণ করে না। আন্তর্জাতিক পরিবেশ, নিরাপত্তা পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক প্রয়োজন এবং নেতৃত্বের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের সঙ্গে কৌশলও পরিবর্তিত হতে পারে। তবে ছোট ও মাঝারি শক্তির রাষ্ট্রগুলোর জন্য অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এড়িয়ে একাধিক শক্তির সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখা অনেক সময় তুলনামূলকভাবে বেশি নিরাপদ ও লাভজনক পথ হয়ে ওঠে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো অন্যের প্রতিযোগিতার অংশ হওয়া নয়, বরং প্রতিযোগিতার মধ্যেও নিজের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখা।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, দেশটি দীর্ঘদিন ধরে তৃতীয় পথ অর্থাৎ ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষার কৌশল অনুসরণ করার চেষ্টা করেছে। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র হিসেবে তৎকালীন সরকার ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ নীতির মাধ্যমে যে ভিত্তি স্থাপন করেছিল, তার মূল দর্শন ছিল রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে বহুমুখী সম্পর্ক গড়ে তোলা। তখন স্বাধীন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির যে মৌলিক দর্শন বিকশিত হয়েছিল, তার মধ্যে ছিল সার্বভৌম সমতা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, অন্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং সব রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার আকাক্সক্ষা। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদেও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি শ্রদ্ধা, অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং জাতিসংঘ সনদের নীতির প্রতি শ্রদ্ধার কথা প্রতিফলিত হয়েছে। অর্থাৎ ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি সাম্প্রতিক কূটনৈতিক কৌশল নয়; এর একটি সাংবিধানিক ও ঐতিহাসিক ভিত্তিও রয়েছে।

পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় সেই নীতির আধুনিক রূপ হতে পারে ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ (স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি) অর্থাৎ কোনো শক্তির শিবিরে সম্পূর্ণভাবে অন্তর্ভুক্ত না হয়ে স্বাধীনভাবে জাতীয় স্বার্থ অনুসরণ করার সক্ষমতা। কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন মানে সবার থেকে দূরে থাকা নয়, আবার সবার সঙ্গে সমান দূরত্ব বজায় রাখাও নয়। বরং এর অর্থ হলো প্রতিটি সম্পর্ককে তার নিজস্ব মূল্য ও রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনের ভিত্তিতে বিচার করা এবং কোনো অংশীদারের সঙ্গে সহযোগিতা যেন অন্য অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করার বাধ্যবাধকতায় পরিণত না হয়, তা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর অর্থ হতে পারে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা যেমন থাকবে, তেমনি ভারতের সঙ্গে প্রতিবেশীসুলভ ও পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক সম্পর্ক, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য ও প্রযুক্তি সহযোগিতা, জাপানের সঙ্গে উন্নয়ন অংশীদারিত্ব এবং রাশিয়া ও অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রয়োজনভিত্তিক সহযোগিতাও অব্যাহত থাকবে। সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিশে^র অন্যান্য রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্কের এই বহুমাত্রিকতা কোনো দুর্বলতার চিহ্ন নয়; বরং আমাদের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা ও নীতিগত স্বাধীনতার ভিত্তি হতে পারে।

তবে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো রাষ্ট্রকে নিজের স্বার্থ নিজেকেই সংজ্ঞায়িত করতে হবে। অন্য শক্তিগুলো বাংলাদেশের জন্য কী চায়, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাংলাদেশ নিজে কী চায়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, রপ্তানি সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক শান্তি এসবকে জাতীয় অগ্রাধিকারের সুস্পষ্ট কাঠামোর মধ্যে এনে তার ভিত্তিতে পররাষ্ট্রনীতির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। কারণ যে রাষ্ট্র নিজের জাতীয় অগ্রাধিকার স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে পারে না, তার পররাষ্ট্রনীতি সহজেই অন্যের অগ্রাধিকারের প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে পড়ে। আর যে রাষ্ট্র নিজের স্বার্থের ভিত্তিতে অংশীদার নির্বাচন করতে পারে, সে তুলনামূলকভাবে ছোট হলেও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় নিজের জন্য কার্যকর কৌশলগত পরিসর তৈরি করতে সক্ষম হয়।

বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের চারপাশে অন্তত চারটি বড় শক্তির স্বার্থ সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। চীন বাংলাদেশকে তার আঞ্চলিক সংযোগ, বাণিজ্য ও অবকাঠামো কৌশলের অংশ হিসেবে দেখে। ভারতের কাছে বাংলাদেশ তার নিরাপত্তা, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বঙ্গোপসাগরীয় কৌশলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে একটি উন্মুক্ত, অবাধ ও স্থিতিশীল সামুদ্রিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠার বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে। অন্যদিকে জাপানও মাতারবাড়ীসহ বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে এই অঞ্চলে তার উপস্থিতি জোরদার করছে। এর বাইরে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্যান্য শক্তিরও বাংলাদেশের বাজার, বাণিজ্য, জলবায়ু, শ্রম, মানবিক নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির পরিসর এখন কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক ভূ-রাজনীতির একটি জটিল বহুপক্ষীয় সমীকরণের অংশ হয়ে উঠেছে।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে মৌলিক প্রশ্ন হলো আমরা কি কোনো একটি শক্তির দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকব, নাকি সবার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করব? প্রশ্নটি নিছক কূটনৈতিক পছন্দের নয়; এর সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং নীতিনির্ধারণী স্বাধীনতা সরাসরি যুক্ত। কোনো একটি বৃহৎ শক্তির ওপর অতিরিক্ত অর্থনৈতিক, সামরিক, প্রযুক্তিগত কিংবা কূটনৈতিক নির্ভরতা তৈরি হলে সেই রাষ্ট্রের নীতিগত প্রভাবও ক্রমে বৃদ্ধি পেতে পারে। তখন সহযোগিতা ও নির্ভরতার মধ্যকার সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। আবার সব শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার নামে যদি বাংলাদেশের নিজস্ব নীতিগত অবস্থান অস্পষ্ট হয়ে যায়, তাহলেও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন দুর্বল হতে পারে। অতএব ভারসাম্য মানে মাঝামাঝি অবস্থান নেওয়া নয়; বরং জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে সুস্পষ্ট অবস্থান রেখে বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে প্রয়োজনভিত্তিক ও পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক পরিচালনা করা।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখতে পাই, ছোট ও মাঝারি শক্তির অনেক সফল রাষ্ট্র কখনোই নিজেদের ভাগ্য একটি মাত্র শক্তির হাতে তুলে দেয়নি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বহু দেশ, বিশেষ করে সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম এবং ইন্দোনেশিয়া, পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। তারা বুঝতে পেরেছে যে কূটনীতির লক্ষ্য কোনো পক্ষের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন নয়; বরং জাতীয় উন্নয়ন ও নিরাপত্তার জন্য সর্বাধিক সুবিধা অর্জন করা। এসব রাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি রাষ্ট্র তার আকারে ছোট হলেও যদি তার কূটনৈতিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয়, নীতির ধারাবাহিকতা থাকে এবং জাতীয় স্বার্থের বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য থাকে, তাহলে বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মধ্যেও তার দরকষাকষির ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে।

সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা এখানে বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে শিক্ষণীয়। ভৌগোলিকভাবে ছোট এই রাষ্ট্রটি চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপানসহ বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে একই সময়ে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রেখেছে। কোনো একটি শক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে অন্য শক্তির সঙ্গে বৈরিতার সমার্থক হতে দেয়নি। ভিয়েতনামও তার পররাষ্ট্রনীতিতে বৃহৎ শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নিজস্ব স্বাধীনতা ও কৌশলগত পরিসর বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। ইন্দোনেশিয়ার ক্ষেত্রেও দেখা যায়, আঞ্চলিক ও বৈশি^ক শক্তিগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা করলেও তারা নিজেদের রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার এবং জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করে। এই অভিজ্ঞতাগুলো বাংলাদেশের জন্য সরাসরি অনুকরণীয় মডেল নয়। কারণ প্রতিটি দেশের ইতিহাস, রাষ্ট্রকাঠামো, অর্থনীতি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি আলাদা। তবে এ উদাহরণগুলো একটি মৌলিক নীতি শেখায়: শক্তিশালী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা এবং সেই রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া এক জিনিস নয়।

বাংলাদেশের জন্যও তাই কূটনৈতিক ভারসাম্যের অর্থ হওয়া উচিত ‘সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক, কারও কাছে নতজানু হওয়া নয়’। চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা যেমন জাতীয় উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, তেমনি ভারতের সঙ্গে সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও প্রযুক্তি সহযোগিতা, জাপানের সঙ্গে উন্নয়ন অংশীদারিত্ব এবং ইউরোপের সঙ্গে রপ্তানি ও বিনিয়োগ সম্পর্কও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এসব সম্পর্ককে পরস্পরের বিকল্প হিসেবে না দেখে একটি বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় কৌশলের পরিপূরক হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কোনো একটি শক্তির সঙ্গে সহযোগিতা করার কারণে অন্য কোনো শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হবে এমন কূটনৈতিক কাঠামো বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে অনুকূল নয়। তবে এই ভারসাম্য রক্ষা শুধু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নয়। এর জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রের সামগ্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জাতীয় পর্যায়ে একটি সুস্পষ্ট ‘কৌশলগত কাঠামো’ (স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক)।

কোন ক্ষেত্রে কোন দেশের সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন, কোন সহযোগিতার সঙ্গে কী ধরনের ঝুঁকি রয়েছে, কোন প্রকল্প জাতীয় সক্ষমতা বাড়াবে এবং কোন নির্ভরতা ভবিষ্যতে কৌশলগত দুর্বলতা তৈরি করতে পারে, এসব প্রশ্নকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। তখন কূটনীতি ব্যক্তিনির্ভর বা তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক প্রয়োজনের প্রতিক্রিয়া না হয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় নীতির অংশে পরিণত হবে। আর এভাবেই বাংলাদেশ পরাশক্তির প্রতিযোগিতার দর্শক বা প্রক্সি না হয়ে নিজস্ব স্বার্থের ভিত্তিতে সেই প্রতিযোগিতা থেকে সর্বোচ্চ জাতীয় সুবিধা আদায় করতে পারবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। যদি চীনের কাছ থেকে অবকাঠামো ও বিনিয়োগ পাওয়া যায়, তবে তা গ্রহণ করা উচিত জাতীয় স্বার্থের আলোকে। যদি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানি ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে, তবে সেটিও কাজে লাগানো উচিত। যদি ভারতের সঙ্গে সংযোগ ও আঞ্চলিক বাণিজ্য আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ায়, তবে সেটিও জাতীয় স্বার্থের অংশ।

একইভাবে জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা অন্যান্য অংশীদারের কাছ থেকে যে সহযোগিতা বাংলাদেশের উৎপাদনশীলতা, প্রযুক্তি, মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে পারে, তাকেও কোনো ভূ-রাজনৈতিক আনুগত্যের মানদ-ে নয়, বরং জাতীয় স্বার্থের বিচারে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। রাষ্ট্র পরিচালনায় আদর্শিক মোহ নয়, বাস্তববাদী বিচক্ষণতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো রাষ্ট্রের পতাকা, রাজনৈতিক ব্যবস্থা কিংবা পররাষ্ট্রনীতির ঘোষিত আদর্শের প্রতি আবেগ দিয়ে নয়; বরং সেই রাষ্ট্রের সঙ্গে নির্দিষ্ট সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য কী ফল বয়ে আনছে, তার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। তবে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন কেবল একটি কূটনৈতিক স্লোগান নয়; এটি অর্জনের জন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতাও প্রয়োজন।

লেখক : ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য
 

সম্পর্কিত খবর

দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন নিশ্চিত করতে প্রয়োজন অবাধ তথ্যের সরবরাহ

দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন নিশ্চিত করতে প্রয়োজন অবাধ তথ্যের সরবরাহ

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে বাড়ছে জনদুর্ভোগ

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে বাড়ছে জনদুর্ভোগ

স্বদেশী ইলিশে বিদেশি ঝাঁজ

স্বদেশী ইলিশে বিদেশি ঝাঁজ

মীনা শিশুদের জন্য জনপ্রিয় টিভি কার্টুন

মীনা শিশুদের জন্য জনপ্রিয় টিভি কার্টুন

খাদ্যের অপচয়রোধে প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ

খাদ্যের অপচয়রোধে প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ

পরিবেশ সুরক্ষা ও স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়াতে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার কমাতে হবে

পরিবেশ সুরক্ষা ও স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়াতে ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার কমাতে হবে

Logo

সম্পাদক : এস.এম জাহিদ আনোয়ার শামীম