Logo
Logo
×

উপসম্পাদকীয়

রাষ্ট্রীয় স্বার্থ বনাম পরাশক্তির প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভারসাম্যের চ্যালেঞ্জ পর্ব ২

asif

asif

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৪১ পিএম

রাষ্ট্রীয় স্বার্থ বনাম পরাশক্তির প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভারসাম্যের চ্যালেঞ্জ পর্ব ২

ড. মাহরুফ চৌধুরী
কোনো রাষ্ট্র বাইরে থেকে যতই স্বাধীনতার কথা বলুক, তার অর্থনীতি যদি অতিরিক্তভাবে একটি বা কয়েকটি উৎসের ওপর নির্ভরশীল হয়, তার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা যদি সীমিত থাকে, তার জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তা যদি দুর্বল হয় এবং তার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিষ্ঠানগুলো যদি অকার্যকর হয়, তাহলে বাস্তবে তার কূটনৈতিক স্বাধীনতার পরিসরও সংকুচিত হয়ে যায়। অর্থাৎ পররাষ্ট্রনীতির স্বায়ত্তশাসন শেষ পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার ওপরও নির্ভরশীল। একটি রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক দরকষাকষিতে যত বেশি সক্ষম, তার অর্থনীতি ও প্রতিষ্ঠান তত বেশি শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন।

দুর্বল অর্থনীতি, প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতা, রাজনৈতিক বিভাজন এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় ঐকমত্যের অভাব কোনো রাষ্ট্রকে সহজেই বহিঃশক্তির প্রভাবের প্রতি সংবেদনশীল করে তোলে। বিশেষ করে যখন একটি দেশের উন্নয়ন অর্থায়ন, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, প্রযুক্তি, খাদ্য কিংবা রপ্তানি বাজারের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হয়, তখন সেই নির্ভরতা ধীরে ধীরে কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে শুধু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নীতির বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি অর্থনীতি, শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, খাদ্য, শিল্পনীতি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার প্রশ্ন।

গবেষকেরা মনে করেন, কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন রক্ষার জন্য অর্থনৈতিক শক্তি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, গবেষণা, দক্ষ মানবসম্পদ এবং একটি সুস্পষ্ট জাতীয় কৌশল অপরিহার্য। এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান, নীতির ধারাবাহিকতা এবং তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা। কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দরকষাকষির ক্ষমতা শুধু কূটনৈতিক ভাষা বা রাজনৈতিক বক্তব্য থেকে আসে না; এর পেছনে থাকে একটি রাষ্ট্রের বাস্তব সক্ষমতা। যে রাষ্ট্র বিকল্প অংশীদার তৈরি করতে পারে, নিজস্ব প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে পারে, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে পারে এবং সংকটের সময়ে নিজের প্রয়োজনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নিজেই পূরণ করতে পারে, সে রাষ্ট্রই বহিঃচাপ মোকাবিলায় তুলনামূলকভাবে বেশি স্বাধীন।

বাংলাদেশের জন্য এর তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি অর্থনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে কোনো একটি দেশ বা শক্তির সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও অপরিহার্য হয়ে না ওঠে। একইভাবে কোনো একটি বাজার গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু একমাত্র বাজার হওয়া উচিত নয়; কোনো একটি প্রযুক্তি প্রয়োজনীয় হতে পারে, কিন্তু তার বিকল্প সক্ষমতা তৈরির উদ্যোগও থাকতে হবে। এই বহুমুখীকরণই অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা (ইকোনমিক রেজিলিয়েন্স) বাড়াবে এবং পররাষ্ট্রনীতিতে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ সম্প্রসারিত করবে। তাই কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের প্রকৃত ভিত্তি বিদেশের সঙ্গে দূরত্ব নয়; বরং দেশের ভেতরে এমন সক্ষমতা তৈরি করা, যার ফলে বাংলাদেশ সহযোগিতা বেছে নিতে পারে প্রয়োজনের কারণে, নির্ভরতার কারণে নয়। এই কারণেই জাতীয় স্বার্থভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি এবং অভ্যন্তরীণ উন্নয়ননীতিকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।

একটি শক্তিশালী অর্থনীতি শক্তিশালী কূটনীতির ভিত্তি তৈরি করে; একটি দক্ষ মানবসম্পদভিত্তিক সমাজ প্রযুক্তিগত নির্ভরতা কমায়; একটি কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে ন্যায্য চুক্তি করার সক্ষমতা বাড়ায়; আর একটি সুসংহত জাতীয় ঐকমত্য পররাষ্ট্রনীতিকে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে অতিরিক্তভাবে দোদুল্যমান হওয়া থেকে রক্ষা করে। বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতা তাই শেষ পর্যন্ত বিদেশি শক্তিগুলোর সদিচ্ছার ওপর নয়, নিজেদের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা কতটা শক্তিশালী করতে পারি তার ওপরই নির্ভর করবে। বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জাতীয় স্বার্থ সম্পর্কে অভ্যন্তরীণ ঐকমত্য গড়ে তোলা। উন্নত ও স্থিতিশীল রাষ্ট্রগুলোতে সরকার পরিবর্তিত হলেও মৌলিক জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে রাষ্ট্রীয় নীতির একটি উল্লেখযোগ্য ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।

সরকার বদলায়, রাজনৈতিক নেতৃত্ব বদলায়, কিন্তু রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বার্থ, কৌশলগত অংশীদারিত্ব এবং আন্তর্জাতিক অবস্থানের মৌলিক ভিত্তি রাতারাতি পরিবর্তন হয় না। এর ফলে একটি সরকার যে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ শুরু করে, পরবর্তী সরকারও প্রয়োজন অনুযায়ী তার মূল্যায়ন ও সংশোধন করে, কিন্তু কেবল রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করে না। এই ধারাবাহিকতা রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক পরিসরে বিশ^াসযোগ্য করে তোলে এবং বিদেশি অংশীদারদের কাছেও নীতিগত স্থিতিশীলতার বার্তা দেয়। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রায়ই দেখা যায়, একটি সরকারের পররাষ্ট্রনৈতিক অগ্রাধিকার পরবর্তী সরকার এসে প্রশ্নবিদ্ধ করে অথবা পূর্ববর্তী সরকারের নেওয়া আন্তর্জাতিক উদ্যোগকে রাজনৈতিক বিরোধিতার অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। এর ফলে শুধু একটি নির্দিষ্ট সরকারের নীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের নীতিগত বিশ^াসযোগ্যতাও দুর্বল হতে পারে।

কোনো বিদেশি রাষ্ট্র যদি মনে করে যে বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক চুক্তি, উন্নয়ন সহযোগিতা কিংবা কৌশলগত অগ্রাধিকার মৌলিকভাবে বদলে যেতে পারে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় তখন, যখন জাতীয় স্বার্থের প্রশ্ন দলীয় স্বার্থের সঙ্গে একাকার হয়ে যায়। পররাষ্ট্রনীতি কোনো সরকারের দলীয় সম্পত্তি নয়; এটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ এবং তার সুফল বা ক্ষতির প্রভাব বহু প্রজন্ম পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। অথচ ভূ-রাজনীতি কোনো পাঁচ বছরের নির্বাচনী চক্রের বিষয় নয়; এটি কয়েক দশকের পরিকল্পনার বিষয়। একটি গভীর সমুদ্রবন্দর, আঞ্চলিক রেলসংযোগ, জ্বালানি অবকাঠামো, প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্ব, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি কিংবা একটি নতুন কূটনৈতিক অংশীদারিত্বের প্রকৃত ফলাফল অনেক সময় একটি সরকারের মেয়াদ অতিক্রম করে প্রকাশিত হয়। একইভাবে আজকের কোনো কৌশলগত সিদ্ধান্তের নেতিবাচক প্রভাবও হয়তো এক দশক বা তারও পরে দৃশ্যমান হতে পারে।

তাই পররাষ্ট্রনীতিতে ‘স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক লাভ’ এবং ‘দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় স্বার্থ’-এর মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য তৈরি করা জরুরি। রাষ্ট্রের মৌলিক কৌশল নির্ধারণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ন্যূনতম ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা এই কারণেই অপরিহার্য। এখানে জাতীয় ঐকমত্যের অর্থ এই নয় যে সরকার, বিরোধী দল, নাগরিক সমাজ কিংবা বিশেষজ্ঞদের প্রতিটি বিষয়ে একই মত থাকতে হবে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মতপার্থক্য স্বাভাবিক এবং প্রয়োজনীয়। বরং প্রয়োজন হলো কোন বিষয়গুলোকে দলীয় প্রতিযোগিতার ঊর্ধ্বে রেখে ‘জাতীয় স্বার্থের মূল ক্ষেত্র’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে, সে বিষয়ে একটি ন্যূনতম ঐকমত্য তৈরি করা। সার্বভৌমত্ব, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বার্থ, গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক সংযোগ, বৈদেশিক বিনিয়োগ, সমুদ্রসম্পদ, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এসব ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় নীতির একটি কাঠামো থাকা প্রয়োজন। সরকার পরিবর্তনের পর সেই কাঠামো পর্যালোচনা, সংশোধন কিংবা উন্নত করা যেতে পারে। কিন্তু প্রতিবার শূন্য থেকে শুরু করা হলে কোনো রাষ্ট্রই দীর্ঘমেয়াদি ভূ-রাজনৈতিক সুবিধা অর্জন করতে পারে না।

আজকের বিশে^ বাংলাদেশ এমন একটি অবস্থানে রয়েছে, যেখানে পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতার মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলারও প্রয়োজন নেই। বরং আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত সুসংহত পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রতিযোগিতাকে সুযোগে রূপান্তর করা। বৃহৎ শক্তিগুলো যখন বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক, কৌশলগত কিংবা কূটনৈতিক সম্পর্ক গভীর করতে আগ্রহী, তখন বাংলাদেশকে তাদের প্রতিযোগিতার নিষ্ক্রিয় ক্ষেত্র না হয়ে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হতে হবে। অর্থাৎ অন্যরা কী চায়, শুধু তা বিবেচনা না করে বাংলাদেশ কী অর্জন করতে চায়, তার একটি সুস্পষ্ট রাষ্ট্রীয় রূপরেখা থাকতে হবে। এই রূপরেখা যত স্পষ্ট হবে, দরকষাকষিতে বাংলাদেশের অবস্থানও তত শক্তিশালী হবে।

চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান কিংবা অন্য যে কোনো শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে একমাত্র মানদ- হওয়া উচিত: এতে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ কতটা সংরক্ষিত হবে কিংবা সম্পর্ক ইতিবাচক পথে অগ্রসর হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে তথ্য, জাতীয় প্রয়োজন এবং সম্ভাব্য সুফল-ঝুঁকির নিরপেক্ষ মূল্যায়নের মাধ্যমে। কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে চিরস্থায়ী বন্ধুত্ব কিংবা স্থায়ী বৈরিতার ধারণায় আবদ্ধ না করে প্রতিটি সম্পর্ককে তার বাস্তব ফলাফলের ভিত্তিতে বিচার করতে হবে। যে সহযোগিতা বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রেখে অর্থনীতি, নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, মানবসম্পদ ও আন্তর্জাতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করে, সেটিকে এগিয়ে নিতে হবে; আর যে কোনো প্রস্তাব ভবিষ্যতে অযাচিত নির্ভরতা বা কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, সেটিকে সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করতে হবে।

শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্য নির্ভর করবে আমরা পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতাকে কীভাবে দেখি তার ওপর। যদি নিজেদের কেবল তাদের প্রতিযোগিতার একটি ভূখ- হিসেবে দেখি, তাহলে অন্যের কৌশলই আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। কিন্তু যদি নিজেদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র, সক্রিয় অর্থনৈতিক অংশীদার এবং নিজস্ব স্বার্থসম্পন্ন আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি, তাহলে একই প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। সেই সুযোগ কাজে লাগানোর পূর্বশর্ত হলো দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে জাতীয় স্বার্থকে স্থান দেওয়া এবং সরকার পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে রাষ্ট্রীয় নীতির প্রয়োজনীয় ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা। কারণ শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতি কেবল শক্তিশালী কূটনীতিক দিয়ে তৈরি হয় না; তার ভিত্তি তৈরি হয় একটি আত্মবিশ^াসী রাষ্ট্র, সুস্পষ্ট জাতীয় অগ্রাধিকার এবং সেই অগ্রাধিকারের প্রতি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অঙ্গীকারের মাধ্যমে।

জার্মান বংশোদ্ভূত মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হ্যান্স মরগেনথাউ (১৯০৪-১৯৮০) একসময় লিখেছিলেন, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নৈতিকতা ও আদর্শের গুরুত্ব থাকলেও শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রগুলো তাদের স্বার্থের আলোকেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তাঁর ‘রাজনৈতিক বাস্তববাদ’ (পলিটিক্যাল রিয়েলিজম)-এর মূল শিক্ষা ছিল আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে বুঝতে হলে রাষ্ট্রের আচরণের পেছনে কাজ করা ক্ষমতা ও স্বার্থের বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা যায় না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সেটিই সত্য। আমাদের কূটনীতির মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত না কে আমাদের বন্ধু, বরং কে কোন ক্ষেত্রে আমাদের জাতীয় লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হতে পারে এবং সেই সহযোগিতার বিনিময়ে বাংলাদেশের কী স্বার্থ রক্ষা ও অগ্রসর হচ্ছে। একই সঙ্গে কোনো অংশীদারের সহযোগিতা গ্রহণের ক্ষেত্রে এটিও নিশ্চিত করতে হবে যে তা যেন বাংলাদেশের নীতিগত স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব কিংবা ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতাকে সংকুচিত না করে।

একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে আঞ্চলিক শক্তি ও অর্থনৈতিক সংযোগকেন্দ্রে পরিণত হতে চায়, তাহলে তাকে আবেগনির্ভর পররাষ্ট্রনীতি থেকে বেরিয়ে এসে স্বার্থভিত্তিক, বাস্তববাদী এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত চিন্তার ওপর দাঁড়াতে হবে। এখানে বাস্তববাদ মানে নীতিহীনতা নয়; বরং নীতিকে বাস্তব সক্ষমতা ও জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলা। সার্বভৌমত্ব, পারস্পরিক সম্মান, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও আন্তর্জাতিক আইন এসব নীতিকে অক্ষুণ্ণ রেখেই বাংলাদেশকে তার কূটনৈতিক দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে হবে। কোনো বৃহৎ শক্তির সঙ্গে সম্পর্ককে ‘শূন্য-সমের দৃষ্টিতে’ (জিরো-সাম পার্সপেক্টিভ) না দেখে সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারণ এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বহুমাত্রিক অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে হবে।

চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং অন্যান্য শক্তি নিজেদের জাতীয় ও কৌশলগত স্বার্থে আমাদের এ অঞ্চলে সক্রিয় থাকবে। এই প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের জন্য যেমন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, তেমনি সৃষ্টি করতে পারে অবকাঠামো, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, বাণিজ্য, মানবসম্পদ ও আঞ্চলিক সংযোগ সম্প্রসারণের অভূতপূর্ব সুযোগ। কিন্তু সেই সুযোগকে জাতীয় সম্পদে পরিণত করার জন্য প্রয়োজন একটি আত্মবিশ^াসী রাষ্ট্র, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, সুস্পষ্ট জাতীয় অগ্রাধিকার এবং ধারাবাহিক পররাষ্ট্রনীতি। অন্যরা বাংলাদেশের জন্য কী পরিকল্পনা করছে তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বাংলাদেশ নিজের ভবিষ্যতের জন্য কী পরিকল্পনা করছে।

রাষ্ট্রীয় স্বার্থের প্রশ্নে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন হওয়া উচিত কোনো শক্তির আনুগত্য নয়, কোনো শক্তির অযথা বিরোধিতাও নয়; বরং স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা, পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সহযোগিতা এবং জাতীয় কল্যাণের সর্বোচ্চ অনুসরণ। পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা চলমান থাকবে; কিন্তু জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব বাংলাদেশেরই। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক শক্তি হবে এমন একটি অবস্থান, যেখানে আমাদের দেশ অন্যের প্রতিযোগিতার ময়দান নয়, বরং নিজের স্বার্থের ভিত্তিতে অংশীদার বেছে নেওয়া একটি আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ও কৌশলগতভাবে স্বায়ত্তশাসিত রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হবে। সেই সক্ষমতাই বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে অর্থবহ করবে এবং একবিংশ শতাব্দীর পরিবর্তনশীল বিশ^ব্যবস্থায় দেশের জন্য একটি মর্যাদাপূর্ণ ও কার্যকর অবস্থান নিশ্চিত করবে।

লেখক : ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য
 

সম্পর্কিত খবর

রাষ্ট্রীয় স্বার্থ বনাম পরাশক্তির প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভারসাম্যের চ্যালেঞ্জ পর্ব ১

রাষ্ট্রীয় স্বার্থ বনাম পরাশক্তির প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের কূটনৈতিক ভারসাম্যের চ্যালেঞ্জ পর্ব ১

দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন নিশ্চিত করতে প্রয়োজন অবাধ তথ্যের সরবরাহ

দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন নিশ্চিত করতে প্রয়োজন অবাধ তথ্যের সরবরাহ

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে বাড়ছে জনদুর্ভোগ

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে বাড়ছে জনদুর্ভোগ

স্বদেশী ইলিশে বিদেশি ঝাঁজ

স্বদেশী ইলিশে বিদেশি ঝাঁজ

মীনা শিশুদের জন্য জনপ্রিয় টিভি কার্টুন

মীনা শিশুদের জন্য জনপ্রিয় টিভি কার্টুন

খাদ্যের অপচয়রোধে প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ

খাদ্যের অপচয়রোধে প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ

Logo

সম্পাদক : এস.এম জাহিদ আনোয়ার শামীম