ড. নাভিদ সালেহ
২৬ আগস্ট সকাল সাড়ে ৮টা। নেপালের পাহাড়ি জনপদ তিমুর আর রসুয়াগাধিতে হালকা ঠান্ডা দিন শুরু হয়েছে যথারীতি। দোকানপাট খুলছে। একজন দোকানির চায়ের কেটলি থেকে ধোঁয়া বেরোতে শুরু করেছে। পথিকদের কেউ হাঁটতে বেরিয়েছেন, কেউ উপভোগ করছেন সবুজেঘেরা পাহাড়ি প্রকৃতি। বৃষ্টিও নেই সেদিন। ঠিক ৮টা ৩৭ মিনিটে, প্রায় ১৫,০০০ ফুট উচ্চতায়, লাংটাং লিরুংয়ের গা থেকে হালকা ভূকম্পনে ধসে পড়ল বরফ আর পাথরের এক বিশাল খ-। প্রায় দেড় কিলোমিটার নিচে, লেন্ডে খোলা নদীর ওপর আছড়ে পড়ল তা আর চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। বেগবান পাহাড়ি নদীর পানিতে মিশ্রিত হলো বরফ, পাথরের খ-াবশেষ। বরফ, পলল আর পাথরে মোড়া ঢল তীব্র বেগে ছুটে চলল উপত্যকার দিকে, তিমুর আর রসুয়াগাধির দিকে। আধ থেকে এক ঘণ্টার ভেতর প্রায় ২৭ ফুট জল ফুলে উঠেছিল লেন্ডে খোলাতে। আর তারই ঢলের তোড়ে ভেসে গেল নিসর্গের মোহাচ্ছন্ন নেপালের এ জনপদ। এ মহাপ্রলয় সেদিন আকাশ ফুঁড়ে বৃষ্টি হয়ে ঝরেনি, বরং অপ্রত্যাশিত তীব্রতায় নেমে আসে সুনীল হিমবাহের বরফস্তর থেকে।
নেপালের এ বন্যা এবং এর ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ বিশ^ব্যাপী আলোড়ন তুলেছে। আমরাও টেলিভিশনের পর্দায় আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বরাতে খবর পেয়েছি, দেখেছি, সমবেদনায় সিক্ত হয়েছি। ভেবেছি, ভাগ্যিস বাংলাদেশ পাহাড়ের পাদদেশের কোনো ভূমি নয়। তবে বন্যা কিংবা পাহাড়ি ঢল কি দেশের সীমানা মানে? পানির গন্তব্য একটিই। উচ্চতর অবস্থান থেকে নিুগামী হওয়া। নেপালের এ বানের পানি তাই ভারত অভিমুখী হয়েছে। পাহাড়ি ঢল লেন্ডে খোলা নদী থেকে ভোটকোশি, ত্রিশূলী, তারপর নারায়ণী নদী হয়ে এখন গ্লক নদীতে পৌঁছেছে। অতিক্রম করেছে তিব্বত, নেপাল ও ভারতের সীমানা। ভারত সরকার এ বানের জল অনুপ্রবেশের আশঙ্কা থেকে বাল্মীকিনগর ব্যারাজের ৩৬টি গেট খুলে দিয়েছে। সতর্কে রেখেছে উত্তর প্রদেশ, বিহারকে। ২৬ থেকে ২৭ আগস্টের ভেতর বাল্মীকিনগর ব্যারাজ প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি পানি নিষ্কাশন করেছে। বিহারের বেশকিছু এলাকায় গ্লক নদী বিপৎসীমার উপর দিয়ে বইতে শুরু করেছে। এ পানি শেষ পর্যন্ত গঙ্গা-পদ্মা নদীব্যবস্থার অংশ হয়ে বাংলাদেশে পৌঁছাবে। তবে হিমালয় থেকে নেমে আসা সেই ধ্বংসাত্মক বন্যার ঢেউ একই তীব্রতা নিয়ে বাংলাদেশে পৌঁছাবে, এমনটি বলা যায় না। কিন্তু ভাটির দিকে যা দেখা দেবে, তা হলো ক্রমশ অস্থিতিশীল হয়ে ওঠা হিমালয়ের ‘জমাট মিনার’ থেকে তৈরি হওয়া নতুন ঝুঁকি।
বৈশি^ক উষ্ণায়নের সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশের যে অংশটি অধিকমাত্রায় পীড়িত হয়ে পড়ছে, তা হলো পাহাড়ি হিমবাহ। আন্তর্জাতিক সমন্বিত পর্বত উন্নয়ন কেন্দ্র বা আইসিআইএমওডি নামের আঞ্চলিক সংস্থা, যার সদস্য বাংলাদেশসহ আটটি দেশ; তাদের মতে, ২০০০ সালের পর থেকে হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহের বরফ গলনের হার দ্বিগুণ হয়েছে। ১৯৭৫ সালের পর থেকে এ অঞ্চলের কোনো কোনো হিমবাহে বরফের পুরুত্ব কমেছে ৮০ ফুটের বেশি। এমনকি, বৈশি^ক উষ্ণায়ন ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে যদি ধরে রাখাও যায়, তবুও আইসিআইএমওডির পূর্বাভাস বলছে, ২১০০ সালের ভেতর হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহগুলো তাদের মোট বরফের আয়তনের প্রায় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হারাতে পারে। আইপিসিসিও প্রায় একই ছবি তুলে ধরছে। ২০১৫ সালের তুলনায় ২১০০ সালের মধ্যে উচ্চ পর্বতে অবস্থিত হিমবাহের বরফ কমপক্ষে ৪২ শতাংশ গলে যাবে এবং গলিত পানি নিঃসরিত হবে। আইপিসিসি এ-ও বলছে যে, হিমবাহের ক্রমাগত পশ্চাদপসরণ নতুন হিমবাহ-হ্রদের সৃষ্টি করবে, যার ফলে পাহাড়ি ঢল, আকস্মিক বন্যা বা গ্লফ এবং ভূমিধস সৃষ্ট দুর্যোগ।
আরেকটি উদ্বেগের কারণ হলো, হিমবাহসৃষ্ট হ্রদের উৎপত্তি। এশিয়ায় পর্বতস্থিত হিমবাহ থেকে ইতোমধ্যে ১১,১২৯টি সম্ভাব্য হিমবাহসৃষ্ট হ্রদ শনাক্ত করা হয়েছে। গাণিতিক মডেল বলছে, ২০৮০ সালের মধ্যে এমন হ্রদের সংখ্যা আরও ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। হ্রদ-ধারণকৃত পানির আয়তন বাড়তে পারে ৪৫ থেকে ৫৫ শতাংশ। গবেষকদের ধারণা, আগামী বছরগুলোতে পাহাড়ি ঢল ও আকস্মিক বন্যার পুনরাবৃত্তি ঘটার আশঙ্কা বাড়বে। বিখ্যাত ভূতত্ত্ববিদ জেমা ওয়াধাম তার ‘আইস রিভার’ শীর্ষক গ্রন্থে বলছেন, বৈশি^ক উষ্ণায়নের মাত্রা অব্যাহত থাকলে ২১৫০ সাল নাগাদ হিমালয়ের ৪৮০০০ হিমবাহের এক-তৃতীয়াংশের সম্পূর্ণ নিঃসরণ ঘটবে। অর্থাৎ, তিনি প্রায় ১৬০০০ হিমবাহ গলনের ইঙ্গিত দিচ্ছেন!
বাংলাদেশের জন্য এ পরিবর্তনের বার্তাটি তাই সুস্পষ্ট। ঠাকুরগাঁও-দিনাজপুর থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়ার ঝিলিক দেখা যায় সত্য, তবে হিমালয় আমাদের সীমানার ভেতরে নেই। অথচ, হিমালয়ের পানি কিন্তু আছে। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র হয়ে সেই পানি শেষ পর্যন্ত আমাদের বদ্বীপেই এসে পৌঁছায়। তাই বাংলাদেশের বন্যা প্রস্তুতি কেবল দেশের ভেতরের বৃষ্টি, নদীর উচ্চতা কিংবা উজানের বাঁধের পানি নিঃসরণের হিসাব-নিকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। হিমবাহের পরিবর্তন, নতুন হিমবাহ-হ্রদের সৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল এবং আকস্মিক পানি প্রবাহের তথ্যও আমাদের আগাম বন্যা পূর্বাভাসের অংশ করে নিতে হবে। নেপাল, ভুটান, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে হিমালয় থেকে বদ্বীপ পর্যন্ত একটি সমন্বিত আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা প্রয়োজন। উপগ্রহের তথ্য, হিমবাহ ও হ্রদের পর্যবেক্ষণ এবং নদীর তাৎক্ষণিক প্রবাহের তথ্য দেশগুলোর মধ্যে দ্রুত বিনিময় করার ব্যবস্থা করতে হবে। গবেষণাতেও বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। কারণ, বিপদের উৎপত্তি আমাদের সীমানার বাইরে হলেও তার পরিণতি আমাদের সীমানার অভ্যন্তরে প্রবেশ করবে-এটিই স্বাভাবিক।
নেপালের তিমুর কিংবা রসুয়াগাধির সেই দোকানি হয়তো সেদিন সকালে চায়ের কেটলি চড়ানোর সময় জানতেনই না হাজার হাজার ফুট উপরে পাহাড়ের গায়ে কী ঘটে চলেছে। বাংলাদেশের কোনো নদীপারের মানুষও হয়তো কোনো এক সকালে একইভাবে জানবেন না, বহু দূরের হিমালয়ে কী বদলে গেছে। এটাই আজকের সময়ের নতুন বাস্তবতা। পানি উঁচু থেকে নিচে নামবেই। তার সামনে কাঁটাতারের বেড়া, সীমানা কিংবা মানচিত্র নেই। হিমালয়ের বরফ গললে তার গল্প তাই কেবল নেপাল কিংবা ভারতের গল্প হয়ে রইবে না। সেই গল্পের শেষ কয়েকটি পাতা লেখা হবে এ বাংলাদেশেও।
ঢলের পানি যে সীমানা জানে না, মানে না।
লেখক : যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস অ্যাট অস্টিন-এ পুরঃ, স্থাপত্য ও পরিবেশ কৌশল অনুষদের অধ্যাপক
