ডেঙ্গু একসময় বর্ষা মৌসুমের ও ঢাকা শহরকেন্দ্রিক রোগ হলেও এখন এটি সারা দেশের ও সারা বছরের একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যা। তবে বর্ষা মৌসুমে সংক্রমণ ব্যাপক মাত্রায় ছড়িয়ে পড়ায় স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর অনেক বড় চাপ তৈরি করে। এবার ডেঙ্গুর সংক্রমণ নিয়ে উদ্বেগের বাড়তি কারণ হলো, মার্চ মাস থেকে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব চলছে। ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী ১ কোটি ৮৯ লাখ শিশুকে হামের টিকা দেওয়ার পরও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এখনো গড়ে প্রতিদিন এক হাজারের বেশি রোগী হামের চিকিৎসা নিতে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। এ অবস্থায় হামের সঙ্গে ডেঙ্গুর সংক্রমণও যদি নিয়ন্ত্রণহীন হয়, তাহলে যত প্রস্তুতি নেওয়া হোক না কেন, স্বাস্থ্যসেবাব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। জুলাই মাসে ৩৬ মৃত্যু এবং ৯ হাজার ২০৬ জন রোগীর হাসপাতালে ভর্তির তথ্যই বলে দেয়, ডেঙ্গু পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর অভিজ্ঞতা বলছে, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গুর সংক্রমণ সর্বোচ্চ চূড়ায় ওঠে। এবার জুলাই মাসে টানা ভারী বৃষ্টি হওয়ায় ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার প্রজননের পক্ষে অনুকূল আবহাওয়া ছিল না। এরপরও জুলাই মাসে সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা আগের ছয় মাসের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি। আবহাওয়াবিদেরা সতর্ক করে দিয়েছেন, এল-নিনোর প্রভাবে এ বছর বর্ষাকালে থেমে থেমে বৃষ্টি ও তুলনামূলকভাবে বেশি গরম থাকতে পারে। এ রকম আবহাওয়া এডিস মশার প্রজননের সবচেয়ে উপযুক্ত হওয়ায় ডেঙ্গু নিয়ে বাড়তি সতর্কতা ও প্রস্তুতি প্রয়োজন বলেই আমরা মনে করি। চলতি বছর দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে ডেন-৩ সেরোটাইপের আধিক্য দেখা যাচ্ছে, যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এ পরিবর্তনের কারণে রোগীদের জটিলতা বাড়তে পারে, বিশেষ করে যারা আগে অন্য সেরোটাইপে আক্রান্ত হয়েছেন। চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম, দীর্ঘস্থায়ী জ্বরের পাশাপাশি এক্সপ্যান্ডেড ডেঙ্গু সিন্ড্রোমের ঘটনাও বাড়ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মশা নিধন জোরদার, দ্রুত রোগ শনাক্ত ও সময়মতো চিকিৎসা শুরুর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) তথ্যমতে, চলতি বছর যেসব ডেঙ্গু নমুনার সেরোটাইপ বিশ্লেষণ করা হয়েছে, তার মধ্যে ৯১.৫ শতাংশই ভেনভি-৩ পেয়েছে। আর বাকি ৮.৫ শতাংশ নমুনায় পাওয়া গেছে ডেনভি-২। এই বছর এখন পর্যন্ত অন্য কোনো সেরোটাইপ শনাক্ত হয়নি। সম্প্রতি ৭১টি নমুনায় আরটি-পিসিআর পরীক্ষার মাধ্যমে আইইডিসিআর এই সেরোটাইপ শনাক্তকরণ পরিচালনা করেছে। আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসের ঝুঁকি মাথায় রেখে ডেঙ্গু নিয়ে সতর্কতা ও প্রস্তুতি জরুরি। ডেঙ্গুর ঝুঁকিপ্রবণ অঞ্চলগুলো চিহ্নিত করে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে জোরালো অভিযান শুরু করা প্রয়োজন। সেইসঙ্গে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসাসেবা যেন নাগালের মধ্যে ও সহজলভ্য হয়, সরকারকে সেদিকেও নজর দিতে হবে।
