দেশে নির্বিচারে গাছ কাটার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে অব্যাহত রয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্প, বনভূমি দখল, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ কিংবা নানা বাণিজ্যিক স্বার্থে গাছ কেটে ফেলার ঘটনা প্রায়ই সামনে আসছে। সাম্প্রতিক এক হিসাবে দেখা যায়, ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত দেশে ৫২ হাজার ৩৭৫টি গাছ নিধনের ঘটনা ঘটেছে। যদিও আগের বছরের তুলনায় এ সংখ্যা কমেছে, তবুও এত বিপুলসংখ্যক গাছ কেটে ফেলার বিষয়টি কোনোভাবেই স্বস্তিদায়ক নয়। গত কয়েক মাসেও দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃক্ষ নিধনের একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে। মৌলভীবাজারের কালাছড়া বনবিটে রাতের আঁধারে গাছ কেটে পাচারের অভিযোগ, নওগাঁয় সরকারি বনভূমি দখল করে গাছ কাটার ঘটনা এবং রংপুরের বদরগঞ্জে বনভূমি দখল করে গাছ উজাড়ের ঘটনা এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ করে তুলছে। আবার উন্নয়নকাজের জন্য শতবর্ষী গাছ কেটে ফেলার ঘটনাও নতুন নয়। বৃক্ষ নিধনের ক্ষতিকর প্রভাব শুধু পরিবেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গাছ কমে গেলে বাতাসের মান খারাপ হয়, তাপমাত্রা বাড়ে, মাটির আর্দ্রতা ও পানি ধারণক্ষমতা কমে এবং জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বন উজাড়ের ফলে বন্য প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে, প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় যখন বেশি করে সবুজায়নের প্রয়োজন, তখন নির্বিচারে গাছ কাটা সেই প্রচেষ্টাকেই দুর্বল করে দিচ্ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে একটি গাছ কাটার পর নতুন গাছ লাগানোর কথা বলা হলেও তার যথাযথ বাস্তবায়ন ও পরিচর্যা নিশ্চিত হয় না। আবার কোথাও হাজার হাজার গাছ কাটার পর প্রতিস্থাপন হিসেবে লাগানো চারার অস্তিত্বও খুঁজে পাওয়া যায় না। এমতাবস্থায় উন্নয়ন প্রকল্পের নামে গাছ কাটার ক্ষেত্রে আরও কঠোর যাচাই করতে হবে। কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে বিকল্প নকশার মাধ্যমে কতসংখ্যক গাছ রক্ষা করা যায়, তা বিবেচনা করতে হবে। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া পরিণত ও পুরোনো গাছ কাটা বন্ধ করতে হবে। বনভূমি দখল, অবৈধভাবে গাছ কাটা ও পাচারের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানোর পাশাপাশি জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে গাছ কাটার অনুমোদন, কাটা গাছের হিসাব এবং প্রতিস্থাপিত চারার টিকে থাকার বিষয়টি প্রযুক্তির মাধ্যমে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। শুধু বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি নিলেই পরিবেশ রক্ষা হবে না; বিদ্যমান গাছগুলোও বাঁচিয়ে রাখতে হবে। আগামী কয়েক বছরে বিপুলসংখ্যক গাছ লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে, যা অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু নতুন চারা রোপণের পাশাপাশি নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন বন্ধ করা না গেলে এ উদ্যোগ কাক্সিক্ষত ফল দেবে না। গাছ কাটা মানে শুধু একটি গাছ হারানো নয়; এর সঙ্গে হারিয়ে যায় ছায়া, অক্সিজেন, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্যের একটি অংশ। তাই উন্নয়নের প্রয়োজনে যতটুকু সম্ভব গাছ রক্ষা এবং অনিবার্য ক্ষেত্রে যথাযথ প্রতিস্থাপন নিশ্চিত করতে হবে।
