Logo
Logo
×

জাতীয়

সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার এবং হত্যা বন্ধ হচ্ছে না

asif

asif

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৪৬ পিএম

সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার এবং হত্যা বন্ধ হচ্ছে না

বিশেষ প্রতিনিধি - লাদেশ-ভারত সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ এবং সীমান্ত হত্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার বিষয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বারবার আশ^াস দেওয়া হলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। সীমান্ত নিরাপত্তা বৃদ্ধি, অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকানো ও যৌথ পাহারার প্রতিশ্রুতি ছাপিয়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে ও নির্যাতনে একের পর এক বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুর ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সামপ্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিগত পাঁচ বছরে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বিএসএফের হাতে অন্তত ১৩৪ জন বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে এককভাবে ২০২৫ সালেই নিহত হয়েছেন ৩৪ জন, যাদের মধ্যে ২৪ জন সরাসরি গুলিতে এবং ১০ জন শারীরিক নির্যাতনে মারা যান। এর আগের বছরগুলোতে যথাক্রমে ২০২৪ সালে ৩০ জন, ২০২৩ সালে ৩১ জন, ২০২২ সালে ২৩ জন এবং ২০২১ সালে ১৮ জন বাংলাদেশি সীমান্ত এলাকায় বিএসএফের সহিংসতার শিকার হয়েছেন। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসেও এই প্রাণঘাতী ধারা অব্যাহত রেখে গড়ে প্রতি মাসে অন্তত একজন করে বাংলাদেশি নাগরিক ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে প্রাণ হারিয়েছেন, যা স্বাধীন দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা ও মৌলিক মানবাধিকারের ওপর বড় ধরনের আঘাত হানছে। সীমান্তে বাংলাদেশিদের ওপর এই অব্যাহত গুলিবর্ষণ ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের বিষয়ে দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। জানা গেছে, জাতীয় সংসদের বিগত এক অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক নিরীহ বাংলাদেশি নাগরিক হত্যার ঘটনাকে মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সংসদে তিনি জানান যে, সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্রের পরিবর্তে অমরণঘাতী বা ‘নন-লিথাল’ অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে ভারতের পক্ষ থেকে একাধিকবার অঙ্গীকার করা হয়েছে। সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্তগুলোতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও বিএসএফের যৌথ নৈশ টহল বাড়ানোর পাশাপাশি যেকোনো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা এড়াতে কোম্পানি ও ব্যাটালিয়ন কমান্ডার পর্যায়ে দ্রুত পতাকা বৈঠকের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন যে, সীমান্তে হত্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে বিজিবি ও বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলনসহ সব দ্বিপাক্ষিক ফোরামে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে জোরালো প্রতিবাদ ও প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু সংসদে সরকারের আশ^াসের পরও মাঠপর্যায়ে বিএসএফের আগ্রাসী আচরণের কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত সীমান্তে আটজনের মৃত্যু হলেও পরবর্তীতে জুলাই ও আগস্টে ফেনীর বিলোনিয়া এবং নীলফামারী সীমান্তে তারেক মিয়াসহ আরও কয়েকজন প্রাণ হারান এবং বহুসংখ্যক নাগরিক গুরুতর আহত হন। সীমান্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ও পুশইন ঠেকাতে গত ২৯ জুলাই নীলফামারী সীমান্তে এবং ১৭ আগস্ট ফেনীর বিলোনিয়া জিরো পয়েন্টে বিজিবি ও বিএসএফের ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ মুখোমুখি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এসব বৈঠকে বিজিবির পক্ষ থেকে নিরীহ ও নিরস্ত্র নাগরিকদের ওপর গুলি চালানো থেকে বিরত থাকা এবং চোরাচালান প্রতিরোধে যৌথ উদ্যোগের ওপর জোর দেওয়া হলেও বিএসএফের মৌখিক প্রতিশ্রুতির বাইরে বাস্তব কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। সূত্র মতে, মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে সীমান্তে বিএসএফের হাতে অন্তত ৩০৫ জন বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ২৮২ জনেরও বেশি মানুষ, যা একটি স্বাভাবিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনার সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র ফুটিয়ে তোলে। সীমান্তে সংঘটিত এসব প্রাণহানিকে নিছক দুর্ঘটনা বা সাধারণ সীমান্ত অপরাধ হিসেবে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই বলে স্পষ্ট মনে করছেন অপরাধবিজ্ঞানী ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতের নিজস্ব আইন কিংবা আন্তর্জাতিক মানদ- অনুযায়ীও সীমান্তে নিরস্ত্র মানুষের ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের কোনো আইনি সুযোগ বা বৈধতা নেই। কোনো নাগরিক সীমান্ত অতিক্রম বা চোরাচালানের মতো অপরাধে যুক্ত থাকলেও তাকে দেশের প্রচলিত আইনে গ্রেফতার ও বিচারের মুখোমুখি করার বিধান রয়েছে, কিন্তু সরাসরি গুলি করে বা নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা স্পষ্টতই বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে এ জাতীয় ঘটনায় বিএসএফের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনি জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়ায় সীমান্তজুড়ে দায়মুক্তির এক ধরনের স্থায়ী সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। বিজিবি ও বিএসএফের যৌথ সমন্বয় সভাগুলোতে বারবার প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার বন্ধের চুক্তি হলেও তা কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে, যার কারণে সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা বারবার মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে। সীমান্তে মানবাধিকার রক্ষা ও নাগরিকদের অকাল মৃত্যু রোধে কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মঞ্চে শক্ত অবস্থান নেওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন আইন ও মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সংশ্লিষ্টদের মতে, সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চয়ই রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু যেকোনো বিচারেই মানুষের জীবনের মূল্য তার চেয়ে অনেক বেশি। ভারতের প্রদত্ত অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশকে প্রতিটি সীমান্তে সংঘটিত হত্যার নিরপেক্ষ তদন্ত, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ক্ষতিপূরণ এবং দায়ী বিএসএফ সদস্যদের শাস্তির আওতায় আনার দাবি জোরালোভাবে তুলতে হবে। সীমান্তে হত্যা শূন্যের কোঠায় নামানোর অঙ্গীকার কবে নাগাদ বাস্তবায়িত হবে এবং ভারতের এই ধারাবাহিক প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের কার্যকর জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত হবে- বর্তমানে সেই প্রশ্নই বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও এসব স্পর্শকাতর বিষয়ে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য বা আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি, তবুও দেশের সীমান্ত এলাকার হাজার হাজার বাসিন্দার জীবন সুরক্ষায় অবিলম্বে স্থায়ী ও কার্যকর সমাধান বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

 

সম্পর্কিত খবর

ওয়েজ বোর্ডসহ সাংবাদিকদের অধিকার বাস্তবায়নে কাজ করছে সরকার: তথ্য প্রতিমন্ত্রী

ওয়েজ বোর্ডসহ সাংবাদিকদের অধিকার বাস্তবায়নে কাজ করছে সরকার: তথ্য প্রতিমন্ত্রী

সাগরে নি¤œচাপ, ৪ সমুদ্রবন্দরে সতর্ক সংকেত

সাগরে নি¤œচাপ, ৪ সমুদ্রবন্দরে সতর্ক সংকেত

ঢাকা মেডিকেলে অসহায় রোগীদের টার্গেট করছে দালালরা: পরিচালক

ঢাকা মেডিকেলে অসহায় রোগীদের টার্গেট করছে দালালরা: পরিচালক

সেনা-র‌্যাব পরিচয়ে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি, যুবদল নেতা গ্রেপ্তার

সেনা-র‌্যাব পরিচয়ে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি, যুবদল নেতা গ্রেপ্তার

সব ধরনের নির্বাচনের প্রার্থীদের ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করতে রুল

সব ধরনের নির্বাচনের প্রার্থীদের ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করতে রুল

নেপালে ভ্রমণে বাংলাদেশি পর্যটকদের সতর্কবার্তা

নেপালে ভ্রমণে বাংলাদেশি পর্যটকদের সতর্কবার্তা

Logo

সম্পাদক : এস.এম জাহিদ আনোয়ার শামীম