Logo
Logo
×

জাতীয়

এলপিজির বাজারে অস্থিরতা, চরম ভোগান্তিতে গ্রাহক

asif

asif

প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪৭ পিএম

এলপিজির বাজারে অস্থিরতা, চরম ভোগান্তিতে গ্রাহক

বিশেষ প্রতিনিধি - মধ্যপ্রাচ্যে বিস্তার লাভ করা যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতার জেরে বাংলাদেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) ভয়াবহ সংকট দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ ঘাটতি এবং অস্বাভাবিক শিপিং ভাড়ার কারণে দেশে এলপিজি আমদানি এক মাসের ব্যবধানে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। সরবরাহ ব্যবস্থার এই নাজুক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দামের তোয়াক্কা না করে অসাধু চক্র সিলিন্ডারপ্রতি ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি হাতিয়ে নিচ্ছে। তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা যায়, সেপ্টেম্বরের শুরুতে বিইআরসি ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১৩ টাকা কমিয়ে ১,৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করলেও খুচরা বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ২,০০০ থেকে ২,১০০ টাকায়, যা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ২,৫০০ টাকায় গিয়ে ঠেকছে। নির্ধারিত দামে গ্যাস না পেয়ে এবং অনেক দোকানে সিলিন্ডার শূন্য থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন রান্নার জন্য এলপিজির ওপর নির্ভর করা প্রায় এক কোটি গ্রাহক। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও বিইআরসির উপাত্ত পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত আগস্ট মাসে দেশে ১৩টি বেসরকারি কোম্পানির মাধ্যমে প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছিল। কিন্তু সেপ্টেম্বর মাসের ২২ তারিখ পর্যন্ত মাত্র ৯টি কোম্পানির মাধ্যমে তা কমে ১ লাখ ১৯ হাজার টনে নেমে এসেছে। দেশে এলপিজি ব্যবসার লাইসেন্সধারী ৫২টি কোম্পানির মধ্যে রিফিলের নিজস্ব প্ল্যান্ট রয়েছে ৩২টির এবং আমদানির সক্ষমতা ২৩টির থাকলেও নিয়মিত এলপিজি আমদানি করছে মাত্র ৮ থেকে ৯টি প্রতিষ্ঠান। সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি স্থাপনায় হামলার কারণে এলপিজির আন্তর্জাতিক মূল্যের পাশাপাশি ফ্রেইট চার্জ বা শিপিং ভাড়া লাগামহীনভাবে বেড়েছে। সেপ্টেম্বর মাসের জন্য বিইআরসি প্রতি টন জাহাজ ভাড়া ১৬০ ডলার ধরে খুচরা মূল্য সমন্বয় করলেও বাস্তবে আন্তর্জাতিক বাজারে এ দর ২৬০ থেকে ৪০০ ডলারে গিয়ে পৌঁছেছে। ফলে লোকসানের ভয়ে বেসরকারি আমদানিকারকরা আমদানি সীমিত রেখে রেশনিং করতে বাধ্য হচ্ছেন। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রোপেন ও বিউটেনের মূল চুক্তি দর (সৌদি সিপি) আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বর মাসে যথাক্রমে প্রোপেন টনপ্রতি ৬২০ থেকে ৬২৫ ডলার এবং বিউটেন ৬৪০ থেকে ৬৬০ ডলারে উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে জাতীয় গ্রিডে প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ ঘাটতি এলপিজি খাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে। জানা গেছে, দেশে দৈনিক প্রায় চার হাজার মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে পেট্রোবাংলা বর্তমানে মাত্র দুই হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করতে পারছে। মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে তিনগুণ বেশি দামে এলএনজি আমদানির জটিলতায় প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ বিঘিœত হচ্ছে। এর ফলে বাসাবাড়ি, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও শিল্পকারখানায় বিকল্প হিসেবে এলপিজির ব্যবহার বহুলাংশে বেড়ে যাওয়ায় আমদানিকারকদের পক্ষে বর্ধিত চাহিদা সামাল দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। দেশে ব্যবহৃত এলপিজির প্রায় ৮০ শতাংশই গৃহস্থালির রান্নায় ব্যবহৃত হয় এবং এই খাতের ৯৯ শতাংশ সরবরাহ আসে বেসরকারি উদ্যোগ থেকে। বাজারে ভারসাম্য আনতে সরকারি প্রতিষ্ঠান বিপিসিকে (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন) সরাসরি এলপিজি আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও তাতে কাক্সিক্ষত গতি ফেরেনি। সূত্র মতে, গত জানুয়ারিতে বিপিসিকে আমদানির অনুমোদন দেওয়া হলেও পাঁচ দফা চেষ্টা চালিয়ে কোনো সরবরাহকারী পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে গত ৪ আগস্ট সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে ‘স্পিড মার্কেটিং’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে ৫ হাজার টন এলপিজি সরবরাহের কাজ দেওয়া হলেও সেই গ্যাস কবে দেশে পৌঁছাবে তা এখনো নিশ্চিত নয়। বাংলাদেশ এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের (লোয়াব) সভাপতি আমিরুল হক এবং স্মার্ট গ্রুপের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্যাপ্টেন মাইনুল আহসান খান জানান, বিশ্ববাজারে বেশি দাম দিয়েও চাহিদামতো এলপিজি মিলছে না। সরকার নিজে যেখানে এলপিজি আনতে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের জন্য লোকসান গুনে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। এদিকে চড়া মূল্যে এলপিজি বিক্রি ঠেকাতে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অভিযান চালিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীদের জরিমানা করছে। তবে পাইকারি পর্যায় থেকেই চড়া দামে সিলিন্ডার কিনতে হওয়ায় খুচরা বিক্রেতারা আইনি ঝক্কি ও জরিমানার ভয়ে দোকান বন্ধ রাখা শুরু করেছেন, যা সরবরাহ সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ববাজার ও শিপিং খরচে বড় ধরনের ফারাক রেখে কেবল প্রশাসনিক অভিযানে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়; এতে বাজারে কৃত্রিম ঘাটতি আরও বাড়তে পারে। বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানান, পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং সংকটকালে কেউ যেন কৃত্রিমভাবে মজুতদারি করে সুযোগ নিতে না পারে সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি রাখা হয়েছে। এদিকে, রান্নার জ্বালানি হিসেবে অতীব জরুরি এই খাতের সংকট দ্রুত নিরসন করা না গেলে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদেরা। সংশ্লিষ্টদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে আগামী অক্টোবরে এলপিজি সংকট আরও কঠিন রূপ নিতে পারে। বাসাবাড়ির রান্না ও শিল্পের চাকা সচল রাখতে সরকারের পক্ষ থেকে আমদানিকারকদের শুল্ক ছাড় দেওয়া কিংবা বাস্তবে জাহাজ ভাড়ার তারতম্য বিবেচনা করে দ্রুত মূল্য পুনঃসমন্বয় করা অত্যন্ত জরুরি। তা না হলে আগামী দিনগুলোতে দেশের এলপিজি বাজার পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ার বড় ধরনের ঝুঁকি থেকে যাবে।

 

সম্পর্কিত খবর

জনআস্থা বজায় রেখে সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালনের আহ্বান রাষ্ট্রপতির

জনআস্থা বজায় রেখে সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালনের আহ্বান রাষ্ট্রপতির

ছিনতাইয়ের পর চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দেওয়া যুবকের মৃত্যু

ছিনতাইয়ের পর চলন্ত ট্রেন থেকে ফেলে দেওয়া যুবকের মৃত্যু

বিমানবন্দরে লাগেজ নিয়ে বিড়ম্বনা, জামায়াতের ৪ এমপির লিখিত অভিযোগ

বিমানবন্দরে লাগেজ নিয়ে বিড়ম্বনা, জামায়াতের ৪ এমপির লিখিত অভিযোগ

সংবিধান থেকে সমাজতন্ত্র-ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দিতে আইনি নোটিশ

সংবিধান থেকে সমাজতন্ত্র-ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দিতে আইনি নোটিশ

নোয়াখালীতে বিশেষ অভিযানে আটক কিশোর গ্যাংয়ের ৬৮ সদস্য

নোয়াখালীতে বিশেষ অভিযানে আটক কিশোর গ্যাংয়ের ৬৮ সদস্য

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে কুষ্টিয়ায় আটক শিক্ষককে বাড়ি পৌঁছে দিল পুলিশ

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে কুষ্টিয়ায় আটক শিক্ষককে বাড়ি পৌঁছে দিল পুলিশ

Logo

সম্পাদক : এস.এম জাহিদ আনোয়ার শামীম