বাংলাদেশকে নদীমাতৃক দেশ বলা হলেও নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা নিয়ে আজ নতুন করে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ তৈরি হয়েছে। একদিকে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে, অন্যদিকে পানযোগ্য হিসেবে ব্যবহৃত পানির বড় অংশই জীবাণু দূষণের ঝুঁকিতে রয়েছে। যে সম্পদ মানুষের জীবনধারণের জন্য সবচেয়ে অপরিহার্য, সেটিই যখন অনিরাপদ হয়ে ওঠে, তখন বিষয়টি কেবল পরিবেশগত নয়, জাতীয় জনস্বাস্থ্যের সংকটেও পরিণত হয়। সাম্প্রতিক বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে, দেশের অধিকাংশ পরিবারের ব্যবহৃত পানিতে মলজনিত জীবাণুর উপস্থিতি রয়েছে। এই বাস্তবতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্বগুলোর একটি। দূষিত পানি দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে ডায়রিয়া, আমাশয়, কিডনি জটিলতা এবং অন্যান্য জলবাহিত রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশু, বয়স্ক এবং দুর্বল স্বাস্থ্যসম্পন্ন মানুষ। ফলে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়। সমস্যার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভূগর্ভস্থ পানির দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যাওয়া। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষিকাজ, শিল্পকারখানা এবং নগরায়ণের কারণে যথেচ্ছভাবে গভীর নলকূপ ব্যবহার করা হচ্ছে। যে পরিমাণ পানি উত্তোলন করা হচ্ছে, প্রকৃতি সেই ঘাটতি পূরণ করতে পারছে না। ফলে অনেক এলাকায় পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাচ্ছে। এটি শুধু বর্তমানের নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও বড় হুমকি। কারণ এক সময় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে, যখন প্রয়োজনীয় পানি উত্তোলন করাই কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, নদী ও খাল দূষণের কারণে ভূপৃষ্ঠের পানি ব্যবহারের সুযোগও দিন দিন কমে যাচ্ছে। শিল্পবর্জ্য, পয়োবর্জ্য এবং বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক পদার্থ নদীতে মিশে পানির স্বাভাবিক গুণাগুণ নষ্ট করছে। ফলে মানুষ বাধ্য হয়ে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, যা সংকটকে আরও তীব্র করছে। আমরা মনে করি, পানি সংকট মোকাবিলায় বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। কোথায় কত পরিমাণ ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা যাবে, সে বিষয়ে কঠোর নীতিমালা কার্যকর করতে হবে। শিল্পকারখানাগুলোতে পানি ব্যবহারের ওপর নিয়মিত নজরদারি বাড়াতে হবে এবং বর্জ্য শোধন ব্যবস্থা বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকর রাখতে হবে। একই সঙ্গে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পুকুর-জলাশয় রক্ষা এবং ভূপৃষ্ঠের পানি ব্যবহারের আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
