তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় কুড়িগ্রামে চরের মানুষের নাভিশ^াস
asif
প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৫৯ পিএম
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি -
কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার চর বিদ্যানন্দ ও চর তৈয়বখাঁ। চারদিকে নদী, মাঝখানে বিস্তীর্ণ চর। বর্ষায় নদীর পানির সঙ্গে লড়াই, আর শুষ্ক মৌসুমে বালুচরে ফসল ফলানোর সংগ্রাম। বছরের পর বছর এই চরের মানুষ কৃষিকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছেন। কিন্তু এবার ধানের জমিতে শীষ এলেও কৃষকের মুখে স্বস্তি নেই। কারণ ফসল বাঁচাতে যে সেচ প্রয়োজন, সেই সেচের জ্বালানি ডিজেল কেনার সামর্থ্যই অনেকের নেই। চরের কৃষকদের জমিতে এখনো বিদ্যুৎ সংযোগ পৌঁছেনি। ফলে বৈদ্যুতিক মোটরের ব্যবহারও নেই। সেচের জন্য তাঁদের নির্ভর করতে হয় ডিজেলচালিত স্যালো মেশিনের ওপর। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় সেই সেচব্যবস্থাই এখন বাড়তি ব্যয়ের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চর বিদ্যানন্দ গ্রামের কৃষক মনসুর আলী (৫০) আমন চাষ করেছেন স্যালো মেশিনের সেচে। বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের এই কৃষক স্ত্রী-সন্তান নিয়ে কৃষিকাজ করেই সংসার চালান। তাঁর হিসাব, প্রতি আমন মৌসুমে সেচের কাজে প্রায় এক ব্যারেল ডিজেল লাগে। খরা মৌসুমে প্রয়োজন হয় প্রায় দুই ব্যারেল। এক ব্যারেলে প্রায় ১৫৯ লিটার ডিজেল ধরে। আগে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ছিল ১১৫ টাকা। সে হিসাবে এক ব্যারেলের দাম পড়ত ১৮ হাজার ২৮৫ টাকা। বর্তমানে লিটারপ্রতি দাম ১৩৫ টাকা হওয়ায় একই পরিমাণ ডিজেলের দাম দাঁড়িয়েছে প্রায় ২১ হাজার ৪৬৫ টাকা। অর্থাৎ শুধু এক ব্যারেলেই বাড়তি খরচ ৩ হাজার ১৮০ টাকা। কৃষক মনসুর আলীর উঠানে এখন সেই স্যালো মেশিন পড়ে আছে। মেশিন আছে, জমিও আছে; আছে ধানের শীষও। সংকট শুধু জ্বালানি কেনার টাকা। মনসুর আলী বলেন, “ আমাগো জমি সবি চরের মধ্যে। জমি যেহানে সেহানে কারেন নাই, মটর নাই। স্যালো মেশিনই আমাগো একমাত্র ভরসা। পকেটে টাহা নাই, তাই মেশিন বাড়িতে নিয়া আইছি। তেল কিনমো কী দিয়ে?”চিন্তার কারণ শুধু তেলের দাম নয়। নদীবেষ্টিত চর হওয়ায় কৃষিকাজের প্রতিটি ধাপে বাড়তি পরিবহন ব্যয় গুনতে হয়। জমিতে যেতে কিংবা সার-বীজ আনতে নদী পার হতে হয় স্যালো ইঞ্জিলের নৌকায়। মনসুর আলীর ভাষ্য, “ধানের শীষ আসা শুরু হয়েছে। এখন পানি দিতে না পারলে এতদিনের আবাদই গচ্ছা যাবে। ডিজেল না কিনতে পারলে সেচ দেব কীভাবে?চ্চরের যাতায়াতের ভোগান্তির কথাও জানান তিনি। তাঁর ভাষায়, “চরে তো রাস্তাঘাট নাই। নদীর ওপারে যাওয়া-আসা করতে নৌকা লাগে। যাতায়াত আর পকেট খরচ মিলিয়ে প্রায় ৪০০ টাকা চলে যায়। অনেক সময় ফেরার সময় নৌকা পাওয়া যায় না। তখন রাতে থাকতে হয়। থাকা-খাওয়ার খরচও যোগ হয়। ”শুধু সেচ নয়, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়ছে কৃষির অন্য খাতেও। সার-বীজ আনতেও নদীর ওপারে যেতে হয়। নৌকার ভাড়া বাড়লে সেই খরচও কৃষকের ঘাড়ে পড়বে। চর তৈয়বখাঁ গ্রামের শরিফুল ইসলাম(৪০) বলেন, এহন তেলের দাম বাড়তি। নাওয়ের(নৌকার) ভাড়াও বাড়াবে। সেচের খরচা বাড়বে। সার আনতেও এহই ভোগান্তি। সারের জন্যও নদীর ওইপারে যেতে হয়। সেহানেও যাওয়া-আসায় বাড়তি ভাড়া গুনতে হবে। আমরা কৃষকরা যামু কোথায়?চরের কৃষকদের জন্য ডিজেলের দাম বাড়ার হিসাব সরাসরি সেচ ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত। প্রতি লিটারে ২০ টাকা দাম বাড়ায় ১৫৯ লিটারের এক ব্যারেলে অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে ৩ হাজার ১৮০ টাকা। খরা মৌসুমে দুই ব্যারেল প্রয়োজন হলে শুধু ডিজেলেই বাড়তি ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬ হাজার ৩৬০ টাকা। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নৌকা ভাড়া, সার-বীজ পরিবহন, শ্রমিকের মজুরি এবং ফসল পরিবহনের খরচ। ফলে ধান ঘরে তোলার আগেই কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ের খাতা ভারী হয়ে উঠছে। চর বিদ্যানন্দের আরেক কৃষক খলিলুর রহমান বলেন, চরে যাওনের বাহন একমাত্র নাও(নৌকা)। তেলের দাম বাড়লে নাওয়ের ভাড়াও বাড়তি হয়। এতে করে সেচ ও কৃষিপণ্য নিয়া আসার খরচ আরও বাড়বে। তিনি আরও বলেন, “তেলের দাম বাড়লে নাওয়ের ভাড়া বাড়বে, সেচের খরচ বাড়বে। সার-বীজ আনতেও খরচ বাড়বে। তাহলে কৃষক যাবে কোথায়?”চর বিদ্যানন্দের কৃষকদের কাছে এই সাময়িক কষ্টই এখন বড় দুশ্চিন্তার বিষয়। কারণ তাঁদের কৃষিকাজ অনেকটাই নির্ভরশীল ডিজেলচালিত সেচযন্ত্রের ওপর। বিদ্যুৎ না থাকায় বিকল্প ব্যবস্থাও সীমিত। চরের মাঠে এখন আমন ধানের শীষ দুলছে। ফসল ঘরে তোলার স্বপ্ন দেখছেন কৃষক। কিন্তু সেই স্বপ্ন টিকিয়ে রাখতে এখনো প্রয়োজন সেচ। আর সেচের জন্য প্রয়োজন ডিজেল। একদিকে জমিতে পাকা হওয়ার অপেক্ষায় ধানের শীষ, অন্যদিকে বাড়ির উঠানে পড়ে আছে স্যালো মেশিন। মাঝখানে শুধু জ্বালানি কেনার সামর্থ্যরে সংকট। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব সম্পর্কে রাজারহাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তুষার কান্তি রায় বলেন, “জ্বালানির দামের বিষয়টি আমাদের নয়। এটা সরকার সিদ্ধান্ত নেয়। ভর্তুকির ব্যবস্থা নেই। তবে কৃষিতে অবশ্যই প্রভাব ফেলবে। সাময়িক কষ্ট হবে তো হবেই। জ্বালানির দাম কমলে কষ্ট লাঘব হবে। ”
