শিক্ষকদের জিপিএফ ফান্ড জালিয়াতি, ১০ কোটি টাকা আত্মসাৎ
asif
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০০ পিএম
বাগেরহাট প্রতিনিধি - বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সাধারণ ভবিষ্য তহবিল (জিপিএফ) থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ দেখিয়ে প্রায় ১০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে শিক্ষা অফিস, হিসাবরক্ষণ অফিস ও শিক্ষকদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি চক্র। এ ঘটনায় চরম বিপাকে পড়েছেন প্রায় দেড় হাজার শিক্ষক। একই সাথে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে উপজেলার অন্যান্য দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও। গত মঙ্গলবার দুপুরে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি দল এ ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। বাগেরহাট জেলা দুদকের সহকারী পরিচালক আবুল কাইয়ুম হাওলাদারের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি মোরেলগঞ্জ উপজেলা শিক্ষা অফিস, হিসাবরক্ষণ অফিস ও সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে এবং বিভিন্ন নথিপত্র যাচাই-বাছাই করে। দুদক কর্মকর্তা আবুল কাইয়ুম হাওলাদার বিকেল ৫টার দিকে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘জালিয়াতির আশ্রয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জিপিএফ ফান্ড থেকে টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। টাকাগুলো ঋণ হিসেবে বিল-ভাউচারের মাধ্যমে সোনালী ব্যাংক থেকে তোলা হয়েছে। এসব লেনদেনের বিষয়ে শিক্ষা অফিস কোনো সঠিক নথি বা রেকর্ড দেখাতে পারেনি।’ হিসাবরক্ষণ অফিসের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘শিক্ষকদের জিপিএফ থেকে টাকা তোলা হলেও লেজার ও অনলাইন হিসাবের মধ্যে ব্যাপক অসংগতি পাওয়া গেছে। এমনকি অনেক প্রয়োজনীয় নথিপত্রও তারা উপস্থাপন করতে পারেনি।’ সোনালী ব্যাংকের ভূমিকা সম্পর্কে তিনি জানান, ‘জালিয়াতির মাধ্যমে সোনালী ব্যাংক থেকে সরাসরি নগদ টাকা তোলা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী এই টাকা সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তা করা হয়নি। তবে এ ক্ষেত্রে শিক্ষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না, পরোক্ষভাবে রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’ এ ঘটনায় সরকারি কোষাগার থেকে মোট কত টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে এবং কোন দপ্তরের কতজন সদস্য এতে জড়িত, তা পুরোপুরি নিশ্চিত হতে আরও সময় লাগবে বলে জানান এই কর্মকর্তা। এ বিষয়ে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শেফাইনূর আরেফিন বলেন, ‘শিক্ষকদের জিপিএফ ফান্ড থেকে টাকা তোলা হলেও তারা সে বিষয়ে কিছুই জানেন না। এখন পর্যন্ত কতজন শিক্ষকের ফান্ড থেকে টাকা সরানো হয়েছে, তার সঠিক হিসাব পাওয়া যায়নি। দিন দিন ভুক্তভোগী শিক্ষকের সংখ্যা বাড়ছে। বিষয়টি বর্তমানে দুদক তদন্ত করছে।’ সোনালী ব্যাংক মোরেলগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপক মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘হিসাবরক্ষণ অফিস থেকে অনুমোদিত বিল-ভাউচারের মাধ্যমে শিক্ষকদের জিপিএফ ফান্ড থেকে ঋণ হিসেবে টাকা তোলা হয়েছে। এখান থেকে বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে জমা এবং সরাসরি নগদ টাকাও তুলে নেওয়া হয়েছে। সকল লেনদেন হিসাবরক্ষণ অফিসের আনুষ্ঠানিক ‘এমবসড’ (ঊসনড়ংংবফ) সিলের মাধ্যমেই সম্পন্ন করা হয়েছে।’ জিপিএফ ফান্ড থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে টাকা তোলার বিষয়ে উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১৪ জন শিক্ষক ইতিমধ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), জেলা প্রশাসক ও দুদক বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। প্রাথমিক ওই অভিযোগে প্রায় ১ কোটি টাকা বেহাত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হলেও শিক্ষকদের দাবি-কমপক্ষে ৭০ জন শিক্ষকের জিপিএফ থেকে ঋণ দেখিয়ে চক্রটি প্রায় ১০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে, যার কিছুই সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা জানতেন না। উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা তন্ময় গোস্বামী বলেন, ‘ঘটনার তদন্ত চলছে। এ জালিয়াতির সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে এ অফিসের কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তাকে ইতিমধ্যে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।’ আত্মসাৎকৃত টাকার পরিমাণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, এখন পর্যন্ত প্রায় ৭ কোটি টাকার গরমিল পাওয়া গেছে। তবে সুনির্দিষ্ট কারণ না জানিয়ে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিতে অপরাগতা প্রকাশ করেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, শিক্ষা অফিস ও হিসাবরক্ষণ অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী শিক্ষকদের ভুয়া স্বাক্ষর জাল করে ঋণের আবেদন জমা দেন এবং ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেন। এই প্রতারক চক্রের সাথে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক-শিক্ষিকাও সরাসরি জড়িত রয়েছেন বলে জোর গুঞ্জন উঠেছে।
