সৈয়দপুরে জীবনযুদ্ধে হার না মানা পত্রিকা সরবরাহকারী মোজাম্মেল হক
asif
প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১১:১৪ পিএম
নীলফামারী প্রতিনিধি - বয়স ৬৫ বছর। তবুও থেমে নেই জীবনযুদ্ধ। জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন কাকডাকা ভোরে সাইকেল চালিয়ে আট কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সৈয়দপুর শহরে আসেন মো. মোজাম্মেল হক। কখনো ঝড়, কখনো বৃষ্টি, আবার কখনো প্রচ- খরা-কোনো প্রতিকূলতাই তাকে দমাতে পারেনি। এভাবেই টানা ৩০ বছর ধরে পত্রিকা সরবরাহের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি। মোজাম্মেল হকের বাড়ি দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার বেলাইচ-ী ইউনিয়নের বাঘাচোরা গ্রামে। সংসারে দুই ছেলে ও এক মেয়ে। সন্তানদের বিয়ে দিয়েছেন। তারা একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করেন। বয়সের ভার বাড়লেও পেশার প্রতি দায়িত্ববোধ আর জীবনসংগ্রামের তাগিদে প্রতিদিনই তাকে ছুটতে হয় সৈয়দপুর শহরে। সৈয়দপুর ম-ল পেপার হাউজে কর্মরত মোজাম্মেল হক জানান, ঢাকা থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকা সেখানে আসে। প্রতিষ্ঠানটির কমিশন এজেন্ট হাজী মজিদুল হক ম-লের অধীনে তিনি পত্রিকা সরবরাহের কাজ করেন। প্রয়োজন হলে পত্রিকা নিয়ে সৈয়দপুর থেকে নীলফামারী শহরেও যেতে হয় তাকে। তিন দশকের কর্মজীবনের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে তিনি বলেন, একসময় মানুষের মধ্যে পত্রিকা পড়ার ব্যাপক আগ্রহ ছিল। গ্রাম কিংবা শহরের কোনো গুরুত্বপূর্ণ খবর প্রকাশিত হলে পাঠকেরা হন্যে হয়ে পত্রিকা খুঁজতেন। সকালে পত্রিকা হাতে না পাওয়া পর্যন্ত অনেকের অপেক্ষা শেষ হতো না। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে মানুষের সেই আগ্রহ অনেকটাই কমে গেছে। ডিজিটাল মাধ্যমের বিস্তারে এখন পত্রিকা ব্যবসায় মন্দাভাব দেখা দিয়েছে। মোজাম্মেল হকের কণ্ঠে ফুটে ওঠে দীর্ঘদিনের জমে থাকা অভিমান। তিনি বলেন, আমরা ঝড়-বৃষ্টি, খরা উপেক্ষা করে নির্দিষ্ট সময়ে গ্রাহকের বাসায় পত্রিকা পৌঁছে দিই। তিল তিল করে পত্রিকা বিক্রির টাকা সংগ্রহ করে মালিকপক্ষের বিল পরিশোধ করি। অথচ পত্রিকা মালিকেরা আমাদের খোঁজখবর রাখেন না। সহযোগিতা তো দূরের কথা, কোনো পত্রিকা বিক্রেতা মারা গেলেও তাদের পত্রিকায় শোকবার্তা প্রকাশ করা হয় না। আক্ষেপের সুরে তিনি আরও বলেন, আমরা বছরের পর বছর পত্রিকা বিক্রি করে মালিকপক্ষের ব্যবসা সচল রাখতে ভূমিকা রাখছি। অথচ আমাদের সুখ-দুঃখের খবর রাখার যেন কেউ নেই। সংবাদপত্রের পাঠক, প্রকাশক ও সংবাদকর্মীদের কাছে পত্রিকা বিক্রেতারা হয়তো আড়ালের মানুষ। কিন্তু পাঠকের হাতে প্রতিদিনের সংবাদপত্র পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভোরের আলো ফোটার আগেই তাদের কর্মব্যস্ততা শুরু হয়। পাঠকের দরজায় পত্রিকা পৌঁছে দিতে তাদের ছুটতে হয় অলিগলি, গ্রাম থেকে শহরে। মোজাম্মেল হকের মতো পত্রিকা সরবরাহকারীরা দীর্ঘদিন ধরে সংবাদপত্রশিল্পের নেপথ্যে নিরলস শ্রম দিয়ে আসছেন। অথচ বয়সের ভার, আয় কমে যাওয়া এবং পেশাগত অনিশ্চয়তার মধ্যেও তাদের জীবনসংগ্রাম থেমে নেই। তিন দশক ধরে পত্রিকা বিলি করে আসা এই মানুষটির প্রত্যাশা-সংবাদপত্রের মালিকপক্ষ যেন তাদের অবদান স্বীকার করে এবং দুঃসময়ে তাদের পাশে দাঁড়ায়। মোজাম্মেল হকের জীবনসংগ্রাম তাই শুধু একজন পত্রিকা বিক্রেতার গল্প নয়; এটি সংবাদপত্রশিল্পের নেপথ্যে থাকা শ্রমজীবী মানুষের অবদান, বঞ্চনা ও স্বীকৃতির আকাক্সক্ষারও প্রতিচ্ছবি।
